
দশ বছরে ইলিশ গবেষণা কোটি কোটি টাকার ১৫ প্রকল্প, শুধুই কাগজ-কলমে বলছেন জেলে ও ব্যবসায়ীরা


পদ্মা ও মেঘনায় ইলিশ রক্ষায় গত এক দশকে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪টি গবেষণা ও একটি ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প পরিচালিত হলেও মাঠপর্যায়ে এর সুফল নিয়ে রয়েছে তীব্র অসন্তোষ। কাগজ-কলমে ডিম ও জাটকা উৎপাদন বৃদ্ধির চিত্র দেখানো হলেও জেলেরা বলছেন, বিগত কয়েক বছরে নদীর ইলিশ মাছ আশঙ্কাজনক হারে কমছে।
দ্রুত মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক কারণগুলো চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদী কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ ইলিশ গবেষকদের।
পদ্মা ও মেঘনার অববাহিকায় জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন ও সংরক্ষণে গত এক দশকে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও মাঠপর্যায়ে এর সুফল মানতে নারাজ জেলে ও ব্যবসায়ীরা।
চাঁদপুরে ইলিশ গবেষণা ইনিস্টিউটের দেয়া তথ্য মতে, ১০ বছরে প্রায় ১৪টি গবেষণা প্রোগ্রাম এবং প্রজেক্টের মাধ্যমে ইলিশ উন্নয়নে কাজ করা হয়েছে।


রাজস্ব বাজেটের অধীনে বাংলাদেশে ইলিশের জনসংখ্যা গতিবিদ্যা এবং স্টক মূল্যায়ন, পরিবর্তনশীল জলবায়ুতে ইলিশ মৎস্যের ওপর চন্দ্র পরিক্রমা, লবণাক্ততা অনুপ্রবেশ, বৃষ্টিপাত এবং পানি প্রবাহের প্রভাব ও উন্নয়ন প্রজেক্টের মাধ্যমে মেঘনা নদী কেন্দ্রে ইলিশ গবেষণা ল্যাবরেটরি স্থাপনসহ ১৪ টি প্রকল্প।
অন্যদিকে মৎস্য বিভাগে দশ বছরের মধ্যে এক মাত্র ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যান ও গবেষণা প্রকল্পের খাতা-কলমে অর্জনগুলোর চিত্র জমকালো মনে হলেও দিন দিন কমছে ইলিশের আকার ও প্রাচুর্যতা, অথচ সংশ্লিষ্টদের তদারকি ও গবেষণা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে অভিযোগ তাদের।
তাদের দাবী, পদ্মা-মেঘনা নদীকেন্দ্রিক জেলে, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা দীর্ঘদিন নিবিড়ভাবে জড়িত। মৎস্য বিভাগ ও গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিনিধিদের দেখা পায় না তারা। তাদের মতে, কয়েক বছর ধরে মাছের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমছে।
রাজরাজেশ্বরের জেলে রিপন মোল্লা বলেন, ‘আমরা পদ্মা-মেঘনাতে মনে করেন জাল বাই, অনেক দিন হয়, অনেক বছর। তবে আগে যা ছিল, এখন গত ১০-১৫ বছরের মধ্যে কোনো মাছ আগের মতন নাই। এখন মনে করেন দিন দিন মাছ খালি কমতেই আছে। উৎপাদন কমতেই আছে, ধরাও কমতাছে। এখন প্রশাসন মনে করেন কি উদ্যোগ নিবে।’
আরেক জেলে মাসুদ মিজি বলেন, ‘জাটকা যদি বন্ধ করে, তাহলে আমাদের মাছের উৎপাদন বাড়বো। আর যদি জাটকা বন্ধ না করতে পারে, তো এ জীবনেও পারতো না। সেনাবাহিনী, আর্মি-বিডিআর নামাইলো, যদি বলে গুলি করে বলে ফালায় দিবো তো, পারতো না।’
বড় স্টেশন মাছ ঘাটের পাইকারী বিক্রেতা মোস্তাফা কামাল বলেন, ‘ গবেষণা মৎস্য লগে মিল নাই এই কারণে। উনারা গবেষণা করে হলো এই অফিসে বইসা। আর আমরা হইলাম নদীর সাথে আর মাছের সাথে এডজাস্ট। এজন্য উনাদের সাথে আমাদের সাথে মিলে না।
হইলে আপনার প্রথমত নদী দূষণমুক্ত করতে হবে, ড্রেজার মুক্ত করতে হবে।
আর যারা অভিযানে নামতেছে, আপনার এবারকার দেখছেন কিনা জানি না। আমাদের মাননীয় এমপি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক ভাই নিজে অভিযানে নামছেন এবং নাইম্মা যাদেরকে অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাদেরকে যাইয়া দেখা গেছে – বডির ভিতরে ঘুমাচ্ছে। শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক ভাই প্রতিটা ইউনিট তৈরি করে দিছেন, এই ইলিশ মাছ রক্ষার জন্য, ঠিক আছে? কিন্তু যাদের কাছে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, তারা সঠিকভাবে পালন করতেছে না।’
ঘাটের ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, চাঁদপুর মাছঘাটে অনেক বিপুল পরিমাণ মাছ ছিল। তখন ঘাটে ২০-২৫ টা ফিশিং ট্রলার থাকত বা দেখেছি। আর ওই সময় মাছের দাম ছিল ১২শ টাকা কেজি, যেই মাছটা বর্তমান ২৫শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
আমরা অসংখ্যবার বলছি যে, ইলিশ মাছ বিলুপ্তির পথে আর ইলিশ মাছের সংখ্যাটা কমে যাওয়ার পিছনে কারণগুলা উঠায়ে ধরছি। আমাদের এই কথাগুলা যদি উনারা আমলে নিত মৎস্য অধিদপ্তর, তাহলে হয়তো এই ইলিশের সংখ্যাটা বাড়ত, ইলিশের প্রজননটা বাড়ত।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জেলে ও ব্যবসায়ীদের কোনো পরামর্শই আমলে নেয়নি। নদীর নাব্যতা হ্রাস, দূষণ এবং সাগরে নিষিদ্ধ ট্রল জালের অবাধ ব্যবহারের কারণেই ইলিশের এই সংকট তৈরি হয়েছে বলে দাবী চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমিতির সভাপতি আবদুল বারী জমাদার মানিক।
তিনি বলেন, ‘আমরা এই পর্যন্ত যতগুলো প্রস্তাব দিয়েছি, আজ পর্যন্ত আমরা দেখি নাই যে ব্যবসায়ীদের কোনো কথা এবং জেলেদের কোনো এডভাইস সাজেশন, এটা আসলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কখনো গ্রহণ করেনি।
আমরা মনে করি বর্তমানে বেশি কাজ করা প্রয়োজন হলো নদীর নাব্যতা বাড়ানো দরকার, নদী দূষণ কমানো দরকার এবং সাগরে— এটা সবচেয়ে সবাই এটা আমরা আজকে অনেক বছর ধরেই এই ব্যাপারে সুপারিশ করছি, যে সাগরে নিষিদ্ধ যে জাল আছে, ট্রল জাল, ট্রল জাহাজ দিয়ে যে মাছ ধরছে, এই জালটা যেন নিষিদ্ধ করা হয়।
এই জালের কারণেই বর্তমানে ইলিশের সবচাইতে বেশি সংকট। এই জাল শুধু ইলিশ না, সাগরের অন্যান্য প্রজাতির মাছও কিন্তু এই জালের কারণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।’
জেলে ও ব্যবসায়ীদের পরামর্শ আমলে নিয়ে নদীখনন ও স্রোত ফিরিয়ে আনতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবণা পাঠানোর কথা জানান মৎস্য বিভাগ।
চাঁদপুর সদর উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, তাদের যে পরামর্শগুলো আমরা সবসময় নেই এবং আমরা কিন্তু এই পরামর্শগুলো উপমহলেও প্রেরণ করি। কিন্তু দেশের সক্ষমতার ভিত্তিতে হয়তো এটা পরবর্তীতে কার্যকর হয়।
যেমন আমরা বারবার বলে আসতেছি যে আমাদের ডুবোচরগুলোকে কেটে দিতে হবে, নদীর স্রোত ফিরিয়ে আনতে হবে, এটা আমাদের জেলেরা যেমন বলে, এটা আমরাও কিন্তু বারবার বলি।
তো আমাদের আমরা আশা করি যে, সরকার কিন্তু এই বিষয়ে সচেতন রয়েছে, খুব শীঘ্রই যেমন খাল খনন কর্মসূচির পাশাপাশি আমাদের এই নদী খনন কাজও খুব শীঘ্রই শুরু হবে।’
অন্যদিকে মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক কারণগুলোর সঠিক গ্যাপ অ্যানালাইসিস করে দীর্ঘমেয়াদী কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে ইলিশের এই খরা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয় বলে জানান ইলিশ গবেষক ড. আনিছুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘যেহেতু পরপর দুবছর কম এসেছে, তাহলে একটা ফিজিবিলিটি স্টাডি করা প্রয়োজন যে এ বিষয়ে কোথায় গ্যাপ আছে। কোনো না কোনো কারণ তো আছেই যেটির কারণে বর্তমান সময়ে বরাবর ইলিশ ক্রমান্বয়ে কম আসা শুরু হয়েছে। এই অ্যাড্রেসটা করা দরকার গ্যাপটা। গ্যাপ অ্যাড্রেস করতে পারলে সেটির ওপর ভিত্তি করে বড় ধরনের লম্বা সময়ের জন্য, দীর্ঘ মেয়াদে বড় ধরনের প্রকল্প হাতে নিয়ে গবেষণা সাজিয়ে সেটা বাস্তবায়নের পরে, সেখান থেকে যে রিকমেন্ডেশন আছে, একই সঙ্গে প্রচলিত যে সমস্ত নিয়মকানুন আছে ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণের জন্য, সেইটি একত্রে করে যদি জোরালোভাবে সেটির বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে একমাত্র আশা করা যায় যে, ইলিশ সম্পদের এই অবস্থা, খারাপ অবস্থা থেকে সেটা ফিরে আসা যেতে পারে। কারণ এখানে অনেকগুলো কারণ খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যেমন দু’ধরনের কারণ অ্যানথ্রোপোজেনিক (মানুষ সৃষ্ট) অপরটি হচ্ছে ন্যাচারাল অর্থাৎ প্রাকৃতিক।’
এদিকে মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় ইলিশ উৎপাদন কমে ৫ লক্ষ মেট্রিক টনে নেমেছে, যেখানে ২০১৫ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ডিম ও জাটকা উৎপাদনের গতিতেও কিছুটা ভাটা পড়েছে।


























