
হাইমচরের আলোচিত শিশু মারাজানা ধর্ষণ ও হত্যার ৯ বছরেও শেষ হয়নি বিচার কার্যক্রম


চাঁদপুরের হাইমচরে ঈশানবালায় ৯ বছর আগে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মারজানা ধর্ষণ ও হত্যার বিচার এখনও পায়নি পরিবার। ৯ বছরে পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি বিচার কার্যক্রম। মামলার ৪ আসামি ২ বছর ধরে জামিনে বেরিয়ে গিয়ে মা-বাবাকে হুমকি-ভয়ভীতি দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর দাবী চলতি বছরেই মামলাটির রায় দিবে আদালত। পরিবারের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে পুলিশ বলছে, অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নয় বছর ধরে শিশু মারজানার এক কপি ছবি আর স্কুল ড্রেসটা ভাঙ্গা ঘরের ভাঙ্গা আলমিরাতে আগলে রেখে হত্যাকরীদের বিচার চেয়ে উদ্বেগ আর উৎকন্ঠার মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন মা-বাবা।


২০১৭ সালের ২২ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর চাঁদপুরের হাইমচরের ঈশানবালা চরে একটি বাজারে বাবা মোকশেদ হাওলাদারের সাথে দেখা করতে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরে শিশু মারজানা। উত্তর চর কোরালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩য় শ্রেণির শিক্ষার্থী মারজানা বাজারে যাওয়ার পথে ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যার শিকার হয়। নরপিশাচরা মারাজানাকে খাল পাড়ের ঝোপঝাড়ে ফেলে রাখে গ্রাম থেকে লাপাত্তা হয়ে যায়।
মামলার আড়াই বছর পর নড়েচড়ে বসে ডিবি পুলিশ। শরীয়তপুর মাছঘাট থেকে কৌশলে গ্রেপ্তার করা হয় প্রধান আসামি নান্নু মিয়াকে। তার দেওয়া তথ্যেই বেরিয়ে আসে বাকি তিনজনের নাম। ঘটনার ৫১ দিন পর উত্তোলন করা হয় মারজানার লাশ। আদালতে সাক্ষ্য দেন ১৪ জন।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ৪ আসামিই জামিনে বেরিয়ে আসে। তারপর থেকেই শুরু হয় নতুন আতঙ্ক। বাদীপক্ষের অভিযোগ, জামিনে এসে আসামিরা এলাকায় বীরদর্পে ঘুরছে। মামলা তুলে নিতে দেওয়া হচ্ছে হুমকি। বলা হচ্ছে টাকা থাকলে সব মামলা উঠিয়ে ফেলা যায়। পথেঘাটে, লোক মারফতে চাপ দেওয়া হচ্ছে। মামলার শুরুতে আসামীর পরিবার ও চেয়ারম্যানসহ মামলা তোলার জন্য মারাজানর বাবাকে মারধর করে তুলে আদালতে নিয়ে যায়।
কান্না জড়িত কন্ঠে মারজানার মা বলেন, ‘তহন, আমাগোরে কইছে, আমার জিয়েরে ভূতে মারছে-শয়তানে মারছে। আমরা তো অজ্ঞানী ছিলাম। আমরা কইতে পারি নাই। পরে গোসলের মহিলারা কইছে যে না ওরে মাইনসে মারছে, ওর প্রস্রবের জায়গায় রক্ত। ওর গালের ভেতর কামড়, বুক আমুড় দিয়ে গোশতটা উঠাইলে। এই যে গলাটার মোগলটা।
পরে ওর আব্বু মামলা করতে গেছে। আত্মীয়স্বজনে গেছে। তার এলাকার চেয়ারম্যান-মেম্বার তো লইয়া ওরা। আমার জিয়ের বিচার না চাওনের লাইগা, মামলা উঠানের লাইগা আমার স্বামীরে, আমার ভাইয়েরে, আমার দেওর গো, সবারে নিয়া মারধর করছে। আমি গরীব দেইখা আমার বিচার পাই না।’
তার বাবা বলেন, ‘আমার বাড়ির পাশের সেলিম, সিদ্দিকী, নান্নু, জালাল মিলে আমার মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ খালপাড়ে ফেলে রাখে।

আমি তারপরে আমার মেয়ের হত্যার বিচার পাওয়ার জন্য আমি এই চাঁদপুর কোর্টে মামলা করি। সেই থেকে এই পর্যন্ত আজকে প্রায় নয় বছর ছয় মাসের উপরে হয়ে গেছে।
আমি কোনো একটা তারিখ মিস করি নাই। শুধু আমার মেয়ের হত্যার বিচার পাওয়ার জন্য। আমার মেয়ের হত্যার বিচার পাওয়ার জন্য আমি কোনো একটা তারিখ এই পর্যন্ত মিস করি নাই। কোর্টের ভিতরে আসছি। প্রতি তারিখে আমি কোর্টের ভিতরে আসছি, মেয়ের হত্যার বিচার পাওয়ার জন্য।
আমার একটাই আপনাদের মাধ্যমে সকলের কাছে চাওয়া। আমি যেন আমার মেয়ের এই শিশু, মেয়ে নয় বছর। ধর্ষণ এবং হত্যাকারীদের বিচার পাই। আমার মেয়ে হত্যার বিচার পাই, এটাই আপনাদের কাছে আমার সকলের কাছে চাওয়া।
এখন আসামিরা জামিনে নিয়ে এলাকাতে ঘুরতেছে এবং আমাকে বিভিন্নভাবে ভয়-ভীতি দেখাচ্ছে। আমাকে বিভিন্ন হুমকি দিচ্ছে। আমি আমার পরিবার নিয়া খুবই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেছি।
এই আসামিদের এমন একটা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সাজা চাই যাতে করে আর কোনো মায়ের সন্তানকে যেন এরকমভাবে হত্যা করতে না পারে।’

মারাজানার গালে এবং বুকে নখের আঁচড়ের দাগের ভয়াবহতা দেখে এলাকাবাসী নির্ভয়ে আদালতে স্বাক্ষী দিয়েছেন। অনেকদিন যাবৎ মামলাটি চলছে। একটা সুষ্ঠু বিচার হওয়া উচিত বলে মনে করেন এলাকাবাসী।
এলাকার কয়েকজনের ভাষ্যমতে, ‘মার্জান ওর বাবার কাছে বাজারে যাইতে গেলে এখানে ধর্ষণকারীরা ধর্ষণ করে মৃতু ঘোষণা নিশ্চিত করে এই জায়গায় পালাইয়া দিয়া গেছে। এরপরে এলাকাবাসী খোঁজাখুঁজি করে এখানে পাইছে। পয়সা পাওয়ার পরে ধরাধরি করে বাজারে নিয়ে গেছে। নেওয়ার পরে সবাই মনে করছে যে শয়তানে মারছে।
পরবর্তী এটা শরীয়তপুর মাছঘাট থেকে এই নান্নু মিয়াকে আটক করার পরে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তিনজন লগে আছিল। হে সহ চারজন। হে স্বীকারোক্তি দিছে। এরকম হইছে।
ওই সময়ের স্থানীয় এক চিকিৎসক বলেন, ‘তখন বাজারে নিয়ে আসছো তখন দেখি যে মৃত। তার গালে এবং বুকে নখের আঁচড়ের দাগ দেখছি।
এই এখন এই মেয়েটার যাতে এটা অনেকদিন যাবৎ এটা চলতেছে এটা একটা সুষ্ঠ বিচার। আমরাও চাই, এটা হওয়া উচিত আমি মনে করি। এটা আদালতে, এই বিষয়ে আমি আদালতে এই কথাই বলছি।’
এদিকে মামলার স্বাক্ষী ও তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের আদালতে হাজির হওয়ার বিলম্ব সময়ে ৯ বছর লেগেছে। চলতি মাসে মামলাটির সব সাক্ষী নেয়া শেষ হয়েছে। এখন আসামিদের জবানবন্দি ও আর্গুমেন্টের পরই রায় আসবে বলে দাবী নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইবুনালের রাস্ট্রপক্ষের আইনজীবীর।
অপরদিকে পুলিশ বলছে, হুমকির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে কোর্টে প্রতিবেদন দিয়ে আসামিদের জামিন বাতিলের আবেদন করা হবে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান, ‘যতটুক জেনেছি এই নয় বছর আগের একটি মামলা। ধর্ষণ করে হত্যার ঘটনা ঘটে। পুলিশ তদন্ত করে আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয় এবং আসামী গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করে। এই মামলাটি বর্তমানে চলমান রয়েছে। বিচারাধীন রয়েছে।
এখন এই বিষয়ে যদি সুনির্দিষ্টভাবে বাদী পক্ষকে হুমকি ধুমকি দেওয়া হয় তাহলে যদি আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করে তার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা কোর্টে প্রতিবেদন দিবো এবং আশা করি তাদের জামিন না মঞ্জুর হবে এবং এই হুমকি ধুমকির বিষয়েও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে।’
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শিরিন সুলতানা মুক্তা বলেন, ‘যেহেতু এই মামলা তো অনেক সাক্ষী সাক্ষীতে আসতে হয়। সাক্ষীদের ওয়ারেন্ট নন ভ্যালু ওয়ারেন্ট হয়েছে। পুলিশ আনতে দেরি হইছে।
অনেক সাক্ষী হয়েছে। এবং টোটাল সাক্ষী ক্লোজ হয়েছে গত আট তারিখে।
এই মামলাটা সকল সাক্ষী ক্লোজ হয়ে গেছে। গত তারিখে আয়ুর স্বাক্ষী শেষ। এখন আগামী তারিখে three fourty two হবে। তারপরে argument টা পর রায় দিয়ে দিবে। খুব দ্রুতই। সাত দিন পর পরই মামলার date টা করতেছে।
ইনশাল্লাহ আমরা খুব সহজেই এই মামলার রায় ঘোষণা হবে। বেশিদিন দেরি হবে না।’
নিহত মারজানা হাইমচরের উত্তর চর কোরালিয়া গ্রামের মোকশেদ হাওলাদার ও সেলিনা বেগম দম্পতির ৪ সন্তানের বড় মেয়ে ছিল। মামলার কারণে দুই বছর বাড়ি ছাড়াও ছিলেন তারা।
নয় বছর পেরিয়ে গেছে। এখনও ঝুলে আছে হাইমচরের ছোট্ট মারজানার বিচার। পরিবারের একটাই দাবি, দ্রুত রায় হোক। আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও আসামিদের পুনরায় গ্রেপ্তার করা হোক। যাতে আর কোনো মায়ের বুক এভাবে খালি না হয়।




























