
আমি যদি পাখি হতাম


এক.
নোরা’র মা ডেইজি বেগম খুব গম্ভীর প্রকৃতির লোক। তিনি সব সময় নিয়ম মেনে চলতে ভালোবাসেন। প্রত্যহ ঘুম থেকে উঠে তার প্রথম কাজ মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা করা। এ জন্য সকালবেলা তিনি খুব ব্যস্ত সময় পার করেন। আজও মেয়েকে সময় মতো স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাগাদা দিলেন। ‘নোরা, তুমি এখনো তৈরি হওনি? তুমি নির্ঘাত ক্লাসে যেতে লেট করবে! গাড়ি অপেক্ষা করছে। দ্রুত চলে এসো, দেরি হয়ে যাচ্ছে।’ মায়ের চিৎকার শুনে নোরা উত্তরে বলল, ‘এই তো বের হচ্ছি মা। জাস্ট এ্যা মিনিট।’
নোরা সকালে ঘুম থেকে উঠেই ঘরের মধ্যে বেশ কয়েকবার পায়চারি করল। গতরাতে সে একটি উপহার কিনে টেবিলের ড্রয়েরে রেখেছিল। সেটা খুঁজে পাচ্ছে না। খুব খারাপ লাগছে নোরা’র। ক্লাস টিচার ম্যাডামকে সে আজ একটা গিফট দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এখন খুঁজে না পেলে সে দিতে পারবে না। কয়েক বার সে ঘরের নানান জায়গায় খোঁজাখুঁজি করল। কিন্তু পেল না। ‘এই টেবিলেই রেখে ছিলাম। কোথায় যাবে? বাড়িতে বাবা-মা ছাড়া আর কেউ নেই- যে তার জিনিসে হাত দেয়।’ নোরা ভাবে। পছন্দের জিনিস না পেলে খুব রাগ হয় নোরার। রাগ হলে খুব মন খারাপ করে। তখন কিছুই ভালো লাগে না। মানুষের মন তোতা পাখির মতো নয়; নিয়ত পরিবর্তনশীল। মন খারাপ থাকলে নোরার নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হয়। জীবন থেকে পালিয়ে বেড়াতে ইচ্ছে করে। এমনটা কেন হয়! নোরা তা জানে না। সে প্রায়ই ভাবে, আমরা মানুষ হয়ে জন্ম নিয়ে ভীষণ ভুল করেছি। মানুষের অনেক কষ্ট। পাখিদের কষ্ট কম। পাখিদের শুধু থাকা-খাওয়ার চিন্তা, কিন্তু মানুষের চিন্তা হাজার রকমের। মানুষের চাওয়া-পাওয়ার কোনো শেষ নেই। খাওয়া-পরার চাহিদা পূরণ হলে তারা বাড়ি-গাড়ির চিন্তা করে। তারপর কীভাবে আরও বড় লোক হওয়ার যায় সে চিন্তা। মানুষ সারাজীবন কেবল অর্থবিত্তের পেছনে ছোটে। মাঝে মাঝে নোরার মনে হয়, সে যদি পাখি হতো; তবে কী মজাই না হতো। নোরা ভাবে, মানুষ মরে গেলে বেহেস্ত-দোজখ পাবে। পাখিরা মরে গেলে কী পাবে? পাখিদেরও কী বেহেস্ত দোজখ আছে! হয়তো আছে, অথবা নেই। সে জানে না। নোরার কাছে পাখিদের জীবন ভীষণ সুন্দর! প্রভাতে পাখির কিচিরমিচির ডাকে মানুষের ঘুম ভাঙে। আবার পাখির ডানায় ভর করে আসে রাতের আঁধার। পাখিদের বলা হয় ভোরের দূত। তারা ঝাঁকে ঝাঁকে দল বেঁধে যে দিকে মন চায় উড়ে যায়। পাখিদের কোথাও যেতে মানা নেই। তাদের চলার পথের কোনো বাউণ্ডারি নেই। চলাচলের কোনো রাস্তা লাগে না। যাতায়াতের জন্য কোনো যানবাহনের দরকার পরে না। তেলের দাম বাড়লেও পাখির কিছু যায় আসে না। সারাদিন মাঠে-ঘাটে, বনে-বাদারে; যেখানে মন চায় ঘুরে বেড়ায়। খুটে খুটে খাবার খায়। সন্ধ্যায় দলবেঁধে ঘরে ফেরে।
নোরা’র সনাতন ধর্মাবলম্বী বন্ধুরা গল্পের ছলে প্রায়ই বলে সৃষ্টিকর্তা মানুষের মৃত্যুর পরে তাদের আবার পৃথিবীতে পাঠাবেন। দুনিয়াতে যারা ভালো কাজ করবে; তারা মানুষ হয়ে আবার এই পৃথিবীতে আসবে। তবে পরের জন্মে সবাই যে মানুষ হয়ে পৃথিবীতে আসবে তা কিন্তু নয়। যার যার কর্ম অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তা তার প্রতিদান দিবেন। তাই কেউ পাখি হয়ে, কেউ পিঁপড়া হয়ে, কেউবা সাপ, ব্যাঙ, কুমির হয়ে, কেউ আবার হাতি, ঘোড়া, শেয়াল হয়েও পৃথিবীতে আসবে। নোরা বন্ধুদের কথা শুনে খুব অবাক হয়! তার দুঃখ সে দ্বিতীয় বার পৃথিবীতে আসতে পারব না। কারণ, ইসলাম ধর্মে পুনর্জন্ম নেই। তবে থাকা উচিত ছিল। যদি থাকত, তবে নোরা পাখি হয়ে আবার পৃথিবীতে আসতে চাইত।
দুই.
নোরা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। বয়স দশ বছর। সে শ্রেণি শিক্ষক শামসুন্নাহার মিসকে ভীষণ পছন্দ করে। ম্যাডাম খুব সজ্জন ব্যক্তি। তিনিও নোরাকে অনেক স্নেহ করেন। ক্লাসে কোনোদিন কাউকে বকা দেন না। সবাইকে খুব আদর করেন। সুযোগ পেয়ে অনেক ছাত্রছাত্রী হোমওয়ার্ক করে না। তারা বাসাতেও পড়াশোনা তেমন করে না। তাই পরীক্ষায় খুব ভালো ফলাফল করতে পারে না। নোরা’র মনে হয়, মিস ভারি বোকা! মাঝে মাঝে বকা না দিলে দুষ্টুরা তার কথা শুনবে কেন? নোরার ইচ্ছা হয় বড় হলে সে মিসের মতো একজন শিক্ষক হবে।
একদিন শামসুন্নাহার মিস নোরাদের ক্লাসে অনেক পশুপাখির ছবি নিয়ে এলেন। তিনি ছবিগুলো সবাইকে ভালো করে দেখতে বললেন। তারপর সবাইকে খাতায় ছবির পশুপাখিগুলোর নাম লিখতে বললেন। সবার খাতা চেক করার পর মিস দেখলেন একমাত্র নোরা ছাড়া অন্য কেউ সবগুলো পশুপাখির নাম লিখতে পারে নি। মিস তখন নোরার খাতায় ‘ভেরিগুড’ লিখে দিয়ে বললেন, ‘তুমি সবগুলো পশুপাখির নাম লিখতে পেরেছ। থ্যাংক ইউ।’ নোরা’র যে তখন কী আনন্দ হয়েছিল তা লিখে বোঝানো যাবে না। মিস সবাইকে পশুপাখিগুলোর সাথে পরিচয় করে দিলেন। বাঘ, সিংহ, হাতি, ঘোড়া, গণ্ডার, জিরাফ, জেব্রা, দোয়েল, শালিক, ময়না, টিয়া, টুনটুনি, মাছরাঙাসহ আরও কত প্রজাতির পশুপাখি যে বাংলাদেশে আছে মিস ছবি না দেখালে হয়তো তা অজানাই থেকে যেতো। ক্লাসের সবাই সেদিন ম্যামের কথা শুনে খুব খুশি হয়েছিল।
শিশুকাল থেকে পশুপাখি নোরার খুব প্রিয়। মাঝে মাঝে তার পাখি পোষার খুব শখ হতো। কিন্তু সেদিন মিস বলেছিলেন, ‘শখের বসে বন্য পশুপাখিদের খাঁচায় বন্দী করে রাখা অথবা ঘরে পোষা একদম ঠিক নয়। পশুপাখি প্রকৃতির সম্পদ। পাখি হলো মুক্ত বিহঙ্গ। পাখিদের দলবেঁধে আকাশে উড়ে বেড়ানোর মাঝে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করা যায়। বন্য পশুপাখি শিকার ও বিক্রি আইনেও দণ্ডনীয় অপরাধ।’
তিন.
আজ ঢাকার সকাল যেন নোরা’র কাছে অন্যরকম লাগছে। কোনো ট্র্যাফিক জ্যাম নেই। পুরো রাস্তা একদম ফাঁকা। ওদের গাড়ি যেন সাঁই সাঁই করে উড়ে যাচ্ছে। গাড়িতে উঠে এখন অবধি নোরার মা আজ কোনো কথা বলেন নি। মায়ের কি শরীর খারাপ! তিনি কি অসুস্থ? নোরা বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করল। নোরার খেয়াল হলো রাতে বোধ হয় মা’র ভালো ঘুম হয় নি। তিনি গাড়িতে উঠে চোখ বন্ধ করে একটু ঘুমিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
নোরাদের ড্রাইভার রাশভারি লোক। তিনি এমনিতেই কম কথা বলেন। গাড়ি চালানোর সময় তো একদম কোনো কথা নেই। তিনি খুব ধীরস্থির আর ঠাণ্ডা মেজাজের মানুষ। উত্তরবঙ্গের বগুড়াতে বাড়ি। ড্রাইভার আংকেলের কোনো নির্দিষ্ট ছুটি নেই। তিনি নোরাদের বাসার গ্যারেজের পাশে একটি ছোট্ট খুপরি ঘরে থাকেন। নিজেই রান্না করে খান। গ্রামের বাড়িতে তার একটি মেয়ে আছে। সে দাদা-দাদির কাছে থাকে। ড্রাইভার আংকেলের কথা মনে হলে নোরা’র অনেক খারাপ লাগে। মানুষের জীবন কত বিচিত্র। আংকেলের জীবনেও কী অনেক কষ্ট! তিনি হয় তো তা কাউকে বলতে পারে না। বাবাকে বলে আংকেলের ছুটির ব্যবস্থা করতে হবে।
চার.
গাড়ি হঠাৎ সজোরে ব্রেক কষতেই সবাই সচেতন হলো। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে নোরা দেখতে পেল তারা স্কুলের গেটের কাছে পৌঁছে গেছে। নোরাকে নামিয়ে মা ব্যাগ নিয়ে গাড়ি থেকে বের হলেন। গেট পার হয়ে নোরা স্কুলের ভেতরে ঢুকতে যাবেÑ এমন সময় মা নোরাকে ডেকে বললেন, ‘আজ তোমাদের ক্লাস টিচার শামসুন্নাহার ম্যাডামের জন্মদিন, তাই না! এই নাও তোমার গিফট; ম্যাডামকে দিয়ে দিও।’ মা তাকে এভাবে সারপ্রাইজ দেবে নোরা তা ভাবতেই পারে নি। সে কোনো কথা বলল না তবে মনে মনে ভীষণ খুশি হলো। ম্যাডামকে জন্মদিনের উপহার দিতে পারবে ভেবে মুহূর্তের মধ্যে তার কচি মুখে আনন্দের রেখা ঢেউ খেলে গেল। এই আনন্দ অপার, অকৃত্রিম। এ আনন্দ কোনো টাকা-কড়ি দিয়ে কেনা যায় না।






























