
মশা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন কার্যকর কিছু পদক্ষেপ


গ্রীষ্মের শুরুতেই মশার উপদ্রব শুরু হয়েছে। সন্ধ্যা নামতে না নামতেই শুরু হয় মশার উৎপাত। দিনের বেলায়ও মশার আক্রমণ থেকে রেহাই মিলছে না। রাতে কয়েল, মশা মারার স্প্রে, মশারি কোনো কিছু দিয়েই মশার কামড় থেকে রেহাই মিলছে না। দুপুরে বিশ্রামের জন্য বিছানায় গেলেও রাতের মতো মশারি টানাতে হয়। মশার কামড়ে চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে মশা নিধনে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ঋতু পরিবর্তনের কারণে হঠাৎ করেই বেড়েছে মশার উপদ্রব। এ ছাড়া নিয়মিত ওষুধ না ছিটানো, ঝোপঝাড় পরিষ্কার না করা, ড্রেনে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকাসহ মশার উপযুক্ত আবাসস্থল বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে মশার উপদ্রব বাড়ছে।
মশা ও মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া নিয়ে প্রতিবছরই একটি নির্দিষ্ট সময়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এ সময় চলে নানা কর্মসূচি, হাতে নেওয়া হয় বড় বড় কর্মপরিকল্পনা, বৃদ্ধি হয় বাজেট। এভাবে মশা নিধনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও কার্যত কতটুকু ফলাফল মিলছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতীয় সমস্যা সমাধানে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে দেখা গেলে আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রেই তা দেখা যায় না। বিশেষ করে মশা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো এ ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে তারা একে অপরের ওপর দোষ চাপিয়ে সময় পার করে দেয়।
মশা নিয়ন্ত্রণ ও নিধন একটি টেকনিক্যাল ও বিজ্ঞানসম্মত বিষয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মশা ও অন্য ভেক্টর বা বাহক নিয়ন্ত্রণের জন্য একক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা অনুসন্ধান, নজরদারি, নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা, গবেষণা এবং প্রযুক্তির সমন্বয়ের মাধ্যমে মশা ও মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। আমাদেরও সে রকম প্রতিষ্ঠান তৈরি করা দরকার, যারা স্বাধীনভাবে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে জবাবদিহির সঙ্গে কাজ করে মশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। টেকসই প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, ব্যবহৃত মশার ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রেখে ক্ষমতায়িত করতে পারলে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান থেকে হয়তো ভালো ফল মিলবে। দেশের প্রতিটি জেলায় ও উপজেলায় থাকবে এর শাখা-প্রশাখা, যারা সারা বছর ধরে এক ছাতার নিচে কাজ করবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি যাদের দায়িত্বের মধ্যে আছে তারা যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে, তাহলে কেন্দ্রীয়ভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই সহজ হবে।


শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও মশার ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করা। মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার। মশা নিয়ন্ত্রণে প্রথম কার্যকর পদক্ষেপ হলো, মশার নজরদারি করা বা প্রাদুর্ভাব স্টাডি করা অর্থাৎ কোন এলাকায় কোন মশা আছে এবং কী পরিমাণে আছে, তা খুঁজে বের করা। দ্বিতীয়ত, ওই সব এলাকায় মশার প্রাদুর্ভাবের সম্ভাব্য কারণ ও উৎস খুঁজে বের করা। তৃতীয়ত, মশা ও প্রজননের ধরন অনুযায়ী মশা নিধন ও নিয়ন্ত্রণে টেকসই পদ্ধতি প্রয়োগ করা। পাশাপাশি ব্যবহৃত ওষুধগুলো কতটুকু কার্যকর এবং এগুলোর বিরুদ্ধে মশা প্রতিরোধ তৈরি করেছে কি না তা-ও পরীক্ষা করে দেখা।
প্রাপ্তবয়স্ক মশা যেহেতু কামড় দেয়, তাই এর গুরুত্ব বেশি বলে মনে হলেও মশা নিয়ন্ত্রণে প্রাপ্তবয়স্ক মশার চেয়ে যে লার্ভা (বাচ্চা) নিধন বেশি জরুরি, তা মানুষ অনুধাবন করতে পারে না। লার্ভা হয়তো কামড়াতে পারে না বলেই এমন ধারণা হতে পারে। কিন্তু মশা মারার চেয়ে মশার প্রজনন রোধ জরুরি। মশা তার জীবনচক্রের প্রথম ১০ দিন পানিতে কাটায়, তারপর যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠে, তখন তাদের মারা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে মাথা মোটা ও গায়ে লোমবিশিষ্ট পাখাবিহীন ঘাসফড়িংয়ের শরীরের মতো দেখতে ছোট ছোট এই বাচ্চাগুলোকে সহজেই মারা যায়। তাই পানিতে থাকা অবস্থায় মশার প্রজনন স্থান নির্ণয় ও নির্মূল করা মশা নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর অংশ। জমে থাকা পানি পরীক্ষা করে সেখানকার মশার লার্ভা নষ্ট করতে হবে এবং এসব জায়গায় যাতে পানি জমে থাকতে না পারে বা মশার প্রজনন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে দেশে ছাদবাগানের প্রবণতা বেড়ে গেছে। এসব বাগানের টবে বা পাত্রে জমে থাকা পানিও মশার বংশবৃদ্ধিতে উপযুক্ত পরিবেশ হিসেবে কাজ করে।



























