চাঁদপুরে ডেঙ্গুর প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, আক্রান্ত ছাড়িয়েছে সহস্রাধিক

মনিরুজ্জামান বাবলু চাঁদপুর
আপডেটঃ সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬ | ৯:২২
Link Copied Successfully!

সারাদেশের পাশাপাশি চাঁদপুরেও এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বর্ষাকালীন মৌসুমে ডেঙ্গুর এই প্রকোপ তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইতিমধ্যেই জেলায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

শরীরে তীব্র জ্বর, বমি, পেটে ব্যথা বা শ্বাসকষ্টের মতো কোনো জটিল লক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে এসে বিনামূল্যে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।

চাঁদপুরে আগস্ট মাসের তুলনায় সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে তিনগুণ। এখন পর্যন্ত জেলায় প্রায় এক হাজার ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা এর চেয়ে অন্তত তিন থেকে চার গুণ। অনেক রোগীই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন না কিংবা তাদের সঠিক তথ্য বা রিপোর্ট সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কাছে পৌঁছায় না।

বিজ্ঞাপন

চাঁদপুর সদর হাসপাতালসহ জেলার অন্যান্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। রোগীর চাপ সামলাতে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা পুরুষ ও নারী ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে।

আক্রান্তদের তীব্র জ্বর, মাথা ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং শরীর ব্যথার মতো উপসর্গ রয়েছে। অনেকের রক্তে প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরবর্তীতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর নিয়মিত চিকিৎসা ও প্লাটিলেট পরীক্ষার মাধ্যমে কিছুটা সুস্থতা বোধ করছেন রোগীরা।

চাঁদপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, ‘দুই সপ্তাহ বাসায় ছিলাম। তারপরে এখানে বৃহস্পতিবার থেকে এসেছি, জ্বর কমে না, কোনো কিছু হয় না। তাই আমি বৃহস্পতিবার দিন এই জায়গায় আসছি। বৃহস্পতিবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি। পরে ভর্তি দিছে। তে এই যে আজ দুই দিন ধইরা পরীক্ষা দিতাছে করতাছি। কমতাছে না কিছুতে কিছু। আবার এই যে জ্বর এই যে বইয়া থাকতে পারি না, মাথা ব্যথা। প্রথমে মাথা ঘুরায়, ভূমি ভূমি, জ্বর আছিল।

বিজ্ঞাপন

শাহমাহমুদপুর থেকে চিকিৎসা নিতে আসা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘এই ডেঙ্গু পজেটিভ নিয়ে এখানে ভর্তি হইছিল। তো আমার পয়েন্ট ছিল ৮১ হাজার। গতকাল সিবিসি করার পরে এটা ৫৪ হাজার এ নেমে আসছিল। আজকে আবার সিবিসি দিছে। শুক্রবারে রাত্রে আসছি, মোশারি পাইনি।’

হাজীগঞ্জ উপজেলা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রাসেল মিয়ার মা নিলুফা বেগম জানান, ‘প্রথম ঘুরান দিয়া পড়ছে, গাড়ির ধারে আইসা আর শুইয়া আছিল। শোয়া থেকে দাঁড়াইছে আর ঘুরান দিয়া পড়ছে। এইদিকেই সদর হাসপাতালে আনা আইনা লগে লোক আছিল। আইনা পরীক্ষা করছে। আমার পুত্রা জিয়ারি জামাইরা ছিল।
পরীক্ষা-টরীক্ষা করার পরে ডেঙ্গু ধরা পড়ছে। এরপরে ভর্তি করাইছে। ভর্তি করাইছে আর ওষুধ-টষুধ বাইরে দিছে আর এখানে চিকিৎসা চলতেছে। কালকে আবার ডাক্তার আইয়া রক্ত পরীক্ষা করছে। দুইটা রক্ত পরীক্ষা দিছে একটা বাহিরের আর একটা ভিতরের। তো এখন আজকে আইলে ডাক্তারে এগুলা দেখব।’

শরিয়তপুর থেকে ছেলেকে নিয়ে চাঁদপুর সদর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মিনু বেগম বলেন, ‘ ‘শরীয়তপুর থেকে আসছি। আর ডেঙ্গু সেবা তো তিন দিন তো, এই যে চার দিন আইছি। ডেঙ্গু সেবা তো পরীক্ষা ডেইলিরটা ডেইলি করতেছে আর বেলায় পরীক্ষা দিতেছে। কালকার পরীক্ষার রিপোর্টে আসছে যে, আমার ছেলের ডেঙ্গুর থেকে এখন আবার টাইফয়েড হয়ে গেছে গিয়া। তো টাইফয়েড পরীক্ষা কালকে দুইটা পরীক্ষা দিছে। একটা পরীক্ষা আমি বাহিরের থেকে নিয়ে করি আনছি।’

চাঁদপুর সদর হাসপাতালে গড়ে ২০ জন ও উপজেলা হাসপাতালগুলো ৪/৫ জন করে জেলায় দৈনিক অর্ধশত ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। বেড ও মোশারী সংকটে বেশিরভাগ হাসপাতালগুলোতে ফ্লোরে নিতে হচ্ছে চিকিৎসা সেবা।

এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ডেঙ্গু শনাক্তকরণের জন্য পর্যাপ্ত কিট এবং চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় স্যালাইনসহ অন্যান্য ওষুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুদ রয়েছে। চিকিৎসকরা রোগীদের বিনামূল্যে যথাযথ সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করছেন তারা।

হাজীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ডা. আহমেদ তানভীর হাসান জানান, ‘ আরেকটা জিনিস হইলো গিয়া যেহেতু বর্ষাকাল সিজন এই সময়ে ডেঙ্গুর প্রভাবটা সারা বাংলাদেশেই বাড়ছে। সেই হিসেবে আমাদের ডেঙ্গুর প্রভাবটা তুলনামূলকভাবে শীতকালের তুলনায় এখনের ডেঙ্গুর প্রভাবটা একটু বেশি। আমার ওয়ার্ডে ডেঙ্গুর রোগী চিকিৎসা সঠিকভাবে ভালোভাবে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে বাসায় পাঠাচ্ছি।’

২৫০ শয্যা বিশিষ্ট চাঁদপুর সদর জেনারেল হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. একেএম মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘সারা দেশেই তো চাঁদপুর ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগস্ট মাসের তুলনায় সেপ্টেম্বর মাসে রোগীর সংখ্যা অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। তো আমাদের কাছে যে এই ডেঙ্গু মোকাবেলা করার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি আছে। আমরা ডেঙ্গুর জন্য বিশেষ করে দুইটা ওয়ার্ড তৈরি করেছি, একটা পুরুষের আরেকটা মহিলার ডেঙ্গু আইসোলেশন ওয়ার্ড। সেখানে রোগীদেরকে নিবিড় তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ডেঙ্গুর ওষুধ এবং কিটের কোন সংকট নেই।

তো আমাদের কাছে যে ধারণা করছে যে সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে ডেঙ্গুর রোগীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

আমরা বলব যে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, কিন্তু ডেঙ্গু যাতে ডেঙ্গু এডিস মশাতে বংশবিস্তার করতে না পারে এজন্য বাড়ির আশেপাশে সব ঝোপঝাড় বা যেখানে মানে মশা বংশবিস্তারের জন্য মানে পানি জমে থাকে এই জায়গাগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।

চাঁদপুর সদর হাসপাতাল চাঁদপুর জেলার পাশাপাশি পাশ্ববর্তী লক্ষ্মীপুর এবং শরীয়তপুর জেলার অনেক রোগী এখানে এসে থাকেন। যেহেতু চাঁদপুরটা আর কি ঢাকার খুব কাছে। চাঁদপুরের অনেক লোক যারা ঢাকায় মানে কর্মসূত্রে ঢাকায় অবস্থান করেন তারাও জ্বর হলে মানে কি মানে পরিবারের সামনে যে থাকার জন্য বাড়িতে এসে চিকিৎসা নেন এবং এখানে চাঁদপুর হাসপাতালে ভর্তি হন।’

ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে মূলত বর্ষাকাল ও এডিস মশার প্রজনন অনুকূল পরিবেশ দায়ী। শুধুমাত্র কিট দিয়ে ডেঙ্গু ডায়াগনোসিস বা চিকিৎসা করে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। বাড়ির আশপাশ এবং জমে থাকা স্থির পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে, যাতে এডিস মশা বংশ বিস্তার করতে না পারে। এর জন্য প্রয়োজন ব্যক্তিগত ও সামাজিক সচেতনতা বলছেন সিভিল সার্জন মোহাম্মদ নুর আলম দীন।
তিনি জানান, ‘এ পর্যন্ত আমাদের ডেঙ্গু রোগী আমরা যারা আইডেন্টিফাইড করতে পারি, প্রায় ১ হাজারের মতো আমরা ডেঙ্গু রোগী আইডেন্টিফাইড করতে পারছি।

কিন্তু আসল যে ফিগারটা সেটা আসলে এর চাইতে তিন-চার গুণ বেশি হবে বলে আমি মনে করি।

কারণ বেশিরভাগ ডেঙ্গু রোগী হয়তো দেখা যায় হাসপাতালে চিকিৎসায় নিচ্ছে না, চিকিৎসা নিল আমাদের কাছে রিপোর্ট হচ্ছে না।

আমাদের হসপিটালগুলোতে ডেঙ্গু রোগী এখনো যদি আপনার উপজেলা পর্যায়ে যান- দেখবেন অনেক ডেঙ্গু রোগী আমাদের হসপিটালগুলোতে ভর্তি আছে।

আর ডেঙ্গু রোগীর জন্য সরকারের যে স্পেশাল কনসার্ন আছে, আমাদের ডেঙ্গু ডায়াগনোসিসের জন্য কিট পর্যাপ্ত আছে, ট্রিটমেন্টের জন্য স্যালাইন বলেন যা বলেন সবই পর্যাপ্ত আছে।

কিন্তু মূল কথা হচ্ছে আসলে কিট দিয়ে ডায়াগনোসিস করে ট্রিটমেন্ট করার চেয়ে ডেঙ্গু আমরা প্রিভেন্ট করতে পারব না।’

সিভিল সার্জন আরো জানান, ‘আমাদেরকে প্রত্যেককে নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হয়ে আমাদের আশপাশটা ক্লিন রাখতে হবে, যাতে কোনো স্টেগনেন্ট ওয়াটার মানে স্থির পানি যাতে আমাদের এখানে না থাকে।
মশার প্রজনন ক্ষেত্রগুলো আমাদের নষ্ট করতে হবে, ধ্বংস করতে হবে।

যদি তার কোনো ধরনের কমপ্লিকেশন দেখা যায়, ইনফেকশনের জন্য উনি খুব বমি করল, পেটে ব্যাথা হলো, ডায়রিয়া হলো, শ্বাসকষ্ট হয়- এই ধরনের কোনো লক্ষণ যদি থাকে, দ্রুত হসপিটালে এসে ভর্তি হবে।

হসপিটালে ট্রিটমেন্ট পাওয়া যায় এবং সেই ট্রিটমেন্টও কিন্তু ফ্রি অফ কস্ট।

আমাদের তো সাতটা উপজেলা আছে এবং আমাদের সদর হসপিটালেও সবখানেই আলাদা করে ডেঙ্গু কর্ণার করা আছে।

কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে, এত ওভারফ্লো ডেঙ্গু কর্ণার আর আমাদের সাধারণ ওয়ার্ডের মধ্যেও ডেঙ্গু রোগীগুলো আছে।’

ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করতে গ্রামের তুলনায় শহরে কীটনাশক স্প্রে করার পাশাপাশি প্রশাসন ও সামাজিক সংগঠনগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে ।

ট্যাগ:

শীর্ষ সংবাদ:
বিমানবন্দরে আটকে গেলেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সাবেক নেতা মাহদী জীবন বাঁচাতে ধানক্ষেতে ছুটেছিল তাজমিন, শেষরক্ষা হলো না শাহরাস্তিতে মেয়ের জন্মদিনের কেক কিনতে গিয়ে বাসচাপায় সৌদি প্রবাসীর মৃত্যু অক্টোবরে প্রথম সপ্তাহে ডেঙ্গুতে ৪৯ জনের মৃত্যু রহিমনগর ইউসুফ সফর আলী দারুলউলুম দাখিল মাদ্রাসার সভাপতি হলেন শরীফ মজুমদার খাল-পুকুরে পোল্ট্রি বর্জ্য, দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ মতলব উত্তরের শতাধিক পরিবার চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চুক্তি সই সম্পন্ন মাদক নির্মূল করার ঘোষণা: রাজারগাঁও ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আব্দুল করিম বেপারী মতলবে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৩ নেতা গ্রেপ্তার চাঁদপুরে আইএফআইসি ব্যাংকের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে র‍্যালি ও কেককাটা চাঁদপুরে মা ইলিশ সংরক্ষণে মৎস্যজীবী দলের নৌ র‍্যালি আবদুল মান্নান মিয়ার মৃত্যুতে মেয়র প্রার্থী জাকির মজুমদারের শোক কচুয়ায় সড়কের পাশ থেকে হেলপারের মরদেহ উদ্ধার, শরীরে আঘাতের চিহ্ন রাজারগাঁওয়ের মাওলানা তানজিম আহমেদের সরকারি শিক্ষা বৃত্তিতে তুরস্ক গমন ফরিদগঞ্জে পুড়েছে সাতটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, রক্ষা পেল শতাধিক সৌদির দুই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের হামলা: নিহত ৩, আহত ৩৬ রুশ বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউক্রেনে ৫ শিশুসহ ২৮ জন নিহত সাংবাদিকদের নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যের পর দুঃখপ্রকাশ করলেন চিকিৎসক চাঁদপুরে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট দগ্ধ শিশু পাঁচদিন পরে মৃত্যু, অপর শিশু আশঙ্কাজনক আজ থেকে চাঁদপুরে ২২ দিনের মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান শুরু, পদ্মা-মেঘনায় সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ