
শান্তর মাঠের গল্পটাও শান্ত


বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখা সম্ভাবনাময় তরুণদের নিয়ে প্রতি বৈশাখেই বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে ‘ছুটির দিনে’। ১৪২৯ বঙ্গাব্দেও ক্রীড়া, অভিনয়, সংগীত, ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা, গবেষণা, অ্যাডভেঞ্চারে অগ্রগামী ৯ তরুণকে নিয়ে হাজির হয়েছে। এখানে পড়ুন ক্রিকেটার মাহমুদুল হাসান জয়ের গল্প।
অনেক দিনের পরিচয়। নির্দিষ্ট করে বললে সেই ২০১৪ সাল থেকে মাহমুদুল হাসান জয়কে চিনি। দুজনই বিকেএসপিতে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছি। খেলার মাঠে নিশ্চয়ই দেখেছেন, বেশির ভাগ সময়ই সে খুব শান্তশিষ্ট। প্রথম যখন পরিচয়, তখন থেকেই ওকে এমন দেখে আসছি। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, মাঠে চরিত্রটা যেমন, মাঠের বাইরে ঠিক উল্টো। জয় তেমন নয়। ও মাঠে যেমন, বাইরেও তা-ই।


সাধারণত ক্রিকেটারদের ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে মাঠে। জয়ও ব্যতিক্রম নয়। তার ব্যাটিংটা দেখুন। ও যেমন শান্তশিষ্ট, ব্যাটিংটাও ঠিক তেমন। শুরু থেকেই দেখেছি, লম্বা সময় ক্রিজে পড়ে থাকতে পারে জয়। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে আপনারা হয়তো জয়ের এক ধরনের ব্যাটিং দেখেছেন। এখন ভিন্ন ধাঁচের একজনকে দেখছেন জাতীয় দলে। ডারবান টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে শতকের পর সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে তার লম্বা সময় ব্যাটিং করার সামর্থ্য নিয়ে।
নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশের টেস্ট জয়ে তার বড় ভূমিকা ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকায় পরের টেস্টেই ওর শতক। এই দুটি ইনিংসেই জয়ের ব্যাটিংয়ে আদর্শ টেস্ট ব্যাটিংয়ের মেজাজ ফুটে উঠেছে। যা দেখে আপনারা কেউ অবাক হতে পারেন, তবে টেস্ট ক্রিকেটে জয়ের সামর্থ্য নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ ছিল না। আমরা যারা জয়কে কাছ থেকে দেখেছি, সবাই জানি যে এটাই জয়। তার দক্ষতাটা এমনই। ভবিষ্যতেও লম্বা সময় ব্যাটিং করে তাকে এমন আরও অনেক বড় ইনিংস গড়তে দেখবেন।
লম্বা ইনিংস খেলতে হলে মানসিকভাবে খুব শক্তিশালী হতে হয়। জয়ের মধ্যে সেই মানসিকতা আছে। নিজের সামর্থ্য বুঝে, তার মধ্যে থেকেই সব সময় ব্যাটিং করার চেষ্টা করে। নিজেকে খুব ভালো চেনে। নিজের শক্তি, দুর্বলতা সম্পর্কে সে খুবই পরিষ্কার। একজন ব্যাটসম্যানের জন্য এটা খুব জরুরি।
ক্রিকেট মাঠে জয় সব সময়ই ‘সাইলেন্ট ক্যারেক্টার’। কেউ স্লেজিং করলেও খুব একটা প্রতিক্রিয়া দেখায় না। নিজেদের মধ্যে যখন আমরা ম্যাচ খেলতাম, তখন জয়কে স্লেজিং করে কোনো লাভ হতো না। চুপচাপ সে নিজের কাজটা করে যেত। নিউজিল্যান্ডে দেখেছি, নিল ওয়াগনার তাকে স্লেজিং করছিল। কিন্তু সে তার দিকে তাকিয়ে শুধু হাসছিল। এটাই জয়। তার কাছ থেকে এমন কিছু দেখেই আমরা অভ্যস্ত।
জয়ের সঙ্গে আমার অনেক মজার স্মৃতি আছে। এত গল্প, কোনটা রেখে কোনটা বলব, বুঝে উঠতে পারছি না। তবে তার সঙ্গে আমার ক্রিকেট মাঠের স্মরণীয় গল্পগুলোর মধ্যে একটা হচ্ছে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল ম্যাচ। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেই সেমিফাইনাল। আমরা বিশ্বকাপের আগে নিউজিল্যান্ড সফরে গিয়েছিলাম। সেখানে জয়ের ৯৯ রানের একটা ইনিংস ছিল। নিউজিল্যান্ড জয়ের পছন্দের প্রতিপক্ষ, আমরা ম্যাচ শুরুর আগে থেকেই জয়কে এটা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিলাম। কথাটা বলতে বলতে আমরা বিষয়টা একেবারে প্রতিষ্ঠিতই করে ফেললাম যে জয়ের পছন্দের প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড।
শেষ পর্যন্ত ওই সেমিফাইনালে তো জয় শতকই করল। সেটাও ম্যাচের কঠিন অবস্থা থেকে। খুব দ্রুতই ২ উইকেট পড়ে গিয়েছিল। ওই জায়গা থেকে এমন নকআউট ম্যাচ বের করে আনা সহজ নয়। ক্রিকেট মাঠে জয়ের সঙ্গে এটা আমার স্মরণীয় স্মৃতিগুলোর একটি।
এত বছরের বন্ধুত্ব, এত সময় একসঙ্গে কাটিয়েছি। মাঠের বাইরেও জয়ের সঙ্গে তাই আমার অনেক স্মৃতি। আমরা যেখানেই খেলতে যেতাম, প্রতিদিন একসঙ্গে রাতের খাবার খেতে বের হতাম। নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকায় আমরা প্রতি রাতে বিভিন্ন খাবার খেতাম। তিন–চারজন একসঙ্গে হয়ে এক দিন টার্কিশ, এক দিন জাপানিজ, এক দিন ইতালিয়ান খাবার খেয়ে দেখতাম।
আমি ভবিষ্যদ্বাণীতে বিশ্বাসী নই। কারণ, ক্রিকেট এমন একটা খেলা, যেখানে কারোরই বলা সম্ভব নয়, কখন কে কেমন করবে। তবে সামর্থ্যের কথা বললে জয় অনেক অনেক কিছু করার ক্ষমতা রাখে। এর মধ্যে সে সেটা করেও দেখিয়েছে। আশা করি, বাংলাদেশ ক্রিকেটকে ভবিষ্যতে ও আরও অনেক কিছু দেবে।




























