
ডাকাতিয়া নদীতে গোসল করতে গিয়ে বাড়ছে মৃত্যু, নেই সচেতনতা


চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা-ডাকাতিয়া নদীর মিলনস্থল থেকে ডাকাতিয়া নদীর প্রথম ৫ কিলো মিটারে গোসল করতে গিয়ে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। নদীর এই ৫ কিলো মিটার ডেঞ্জারজোন হিসেবে দেখছেন নদী কেন্দ্রের ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ। বিকল্প পানির ব্যবস্থা না থাকায় মৃত্যু আতংকে নদীপাড়ের হাজারও পরিবার।
ফায়ার সার্ভিস বলছে, নদীতে গোসল করতে না যাওয়া ও অভিভাবকদের সচেতনতা প্রয়োজন। আর বেশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করা হবে বলে আশ্বাস জেলা প্রশাসক।
চাঁদপুর শহরের উত্তর গুণরাজদী আল-আমিন এতিমখানার সুপার ও মসজিদের ইমাম মুফতী মো. শামছুদ্দিন। সম্প্রতি ডাকাতিয়া নদীতে গোসল করতে নেমে তলিয়ে যান তিনি। বিয়ের সাত মাসের মাথায় অন্তঃস্বত্তা স্ত্রীকে রেখে ডাকাতিয়ার ভয়াল থাবায় প্রাণ যায় তার।


একই নদীতে গোসল করতে গিয়ে বাগাদী ইউনিয়নের মমিপনুর গ্রামের দুই শিশু শাহাদাত (৫) ও মাহমুদ (৬) তলিয়ে যায়। তারা সর্ম্পকে চাচাতো ভাই। পৃথক দুই পরিবারে একমাত্র ছেলে সন্তানদের হারিয়ে শোকাহত তারা। এভাবে গেল এপ্রিল মাসেই ডাকাতিয়া নদীতে সাতজনের মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে ডাকাতিয়া নদীরপাড়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের সাপ্লাইয়ের পানির ব্যবস্থা ও পুকুর না থাকায় নদীর পানিতে নির্ভর বলছেন স্বজনহারা ও নদীপাড়ের বাসিন্দারা।
মাদ্রাসার শিক্ষক বলেন, এখানে ওনি জামা-কাপড় ধুয়ে এখানে রোদ্রে দিয়েছিলেন। তারপরে ওনি নিজে গোসল করতে নেমেছিলেন। গোসল করতে একটু সাঁতরে মাঝখানে গিয়েছিলেন। এরপর থেকে আর ওনাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তিতে ডুবুরী ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেয়া হইছে। ওনি এখানকার একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি ছিলেন
মুফতী মো. শামছুদ্দিনের নিকটাত্মীয় মাসুদ হাসান বলেন, ‘ডাকাতিয়া নদী যেভাবে জীবন কেড়ে নিচ্ছে, আমরা চাইবো- এটা থেকে রক্ষার জন্য প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিবে। ইতোমধ্যে মমিনপুর মাদ্রাসার দুইজন বাচ্চা নদীতে শলিল সমাধি হলো। মুফতি শামছুদ্দিন মারা যাওয়ার দুইদিন আগে মুখার্জি ঘাটলায় একই ধরণের ঘটনা ঘটলো। তার আগে আরেকটা দুর্ঘটনায় বৃদ্ধের লাশ ভেসে উঠে গোসল করতে গিয়ে। মুফতি শামছুদ্দিন ঠিক একইভাবে গোসল করতে গিয়ে হারিয়ে গেছে।
নদীতে ঘুর্ণিয়মান স্রোত, গুপ্ত পকেট, এ সকল বিষয় নিয়ে প্রশাসন যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা নিতে হবে- সচেতন করতে হবে জনগণকে- মানুষের জীবন রক্ষার্থে।
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের এখানে সরকারীভাবে যে ব্যবস্থাগুলো আছে- ভেতরে আশ্রয়ণ প্রকল্পে পুস্কুনীর ব্যবস্থা গুলো ভালো না। পানির নিষ্কাশনগুলো ভালো না। পানি থাকে না পর্যাপ্ত। আমাদের বাচ্চাদের-মহিলাদের সবাই এখানে গোসল করতে আসতে হয়। ¯স্রোতের কারণে দূরাবস্থা হয়। কয়দিন পরপরই বাচ্চাদের একটা দুর্ঘটনা ঘটে- বয়ষ্ক সবারই দুর্ঘটনা ঘটে।
নদীরপাড়ের বাসিন্দ রহিমা বেগম বলেন, ‘বাসা-বাড়িতে গোসলখানা নাই, কল নাই, কিছুই নাই, সাপ্লাইয়ের পানিও নাই। এ কারণে আমরা নদীতে আসতে হয়। বাচ্চাদের গোসল করাইতে হয়, গা-গোসল নিজেও নিজেও ধুতে হয়। কাপড়-চোপড় ধুতে হয়- থালা-বাটি ধুতে হয়। এ কারণে সব ধরণের কষ্ট হয়- নদীতে আইসা আশপাশে অনেক মানুষও মারা গেছে, আমগো বড় মানুষও মারা গেছে।
গুনরাজদী এলাকার নিলুফা বেগম বলেন, ‘সাপ্লাইয়ের পানির ব্যবস্থা করে তাহলে আমাগো সুবিধা হয় আরকি। নদীতে আর আসা লাগে না। আমরা বাসায় বইসা কাজ করতে পারি। নদীতে আসলে বাচ্চারা পানিতে পইড়া যায়, বয়স্ক মানুষ পানিতে ডাবাইয়া যায়। ডুব দিলে আর ফিইরা উঠে না । পরে লাশ ভাইসা উঠে। আমাদের এখানে পানির ব্যবস্থা নাই। এই কারণে আমরা নদীতে কাজ করি। কয়েকদিন পর পরই আমগো আশপাশের অনেক মানুষই মারা যায়। আমগো ভয় লাগে কাজ করতে। আমরা চাই আমাদের এলাকায় পানির ব্যবস্থা হোক।’
শুধু মাত্র গেল দুই বছরে তিন নদীতে প্রায় অর্ধশত মৃতদেহ উদ্ধার করে চাঁদপুর নদী কেন্দ্রের ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরী দল। যার মধ্যে ডাকাতিয়া নদীর এই ৫ কিলো মিটারের মধ্যে নিখোঁজ থাকায় ২০২৪ সালে ৯ জন, ২০২৫ সালে ৭ জন ও ২০২৬ সালে ৪ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করে তারা। তাদের পরিসংখ্যানের বাহিরেও ডাকাতিয়া নদীতে মৃত্যুর একাধিক সংখ্যা রয়েছে।
ইতোমধ্যে ডাকাতিয়া নদীতে গোসল করতে গিয়ে মৃত্যুর ৫ টি কারণ ও উত্তোরণের উপায় নির্ণয় করে বাসা-বাড়ীতে সচেতনতা লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করার তাগিদ নদী কেন্দ্র ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার রাকিবুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিসংখ্যানে ২০২৫ সালে মোট ৩৫ টি কলে লাশ উদ্ধার করছি ২৪ জন, ২০২৬ সালে এপ্রিল পর্যন্ত কল পেয়েছি ৭ টি, লাশ উদ্ধার করেছি ৫ টি লাশ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। তার মধ্যে বেশিরভাগই ডাকাতিয়া নদীতে, কারণ এখানে বিশেষ করে বাচ্চারা ডুবে যায়। বাচ্চারা সাঁতার কম জানে, পানির ¯স্রোত- জোয়ার ভাটার প্রবলের কারণে বাচ্চারা ডুবে যায় বেশি।
আমরা প্রধানত ৫ টি কারণ পেয়েছি। এবং উত্তোরণেরও ৫ টি উপায় পেয়েছি। এরমধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ হলো- নদীতে গোসল করতে যাওয়া, সাঁতার না শেখা. দীর্ঘক্ষণ গোসল করা, নদীতে খেলাধুলা করা ইত্যাদি ইত্যাদি করা। এসমস্ত কারণে আবার দেখা গেছে, অনেকেই ব্রীজ থেকে লাফ দেয়া, গাছ থেকে লাফ দেয়, বাল্বহেড থেকে লাফ দেয়, অনেক সময় পাকার সাথে বেঁধে যায় ইত্যাদি ইত্যাদি কারণে দুর্ঘটনা ঘটে।
তিনি আরো জানান, উত্তোরণের উপয় গুলো হলো- যদি পৌর কর্তৃপক্ষ যদি একটু প্রচার চালাতো, বাড়ীতে বাড়ীতে কিছু লিফলেট বিতরণ করে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যদি একটু প্রচারণা চালানো হয়। যদি আমরা সাঁতার শিখাই সবাইকে, বাচ্চাদেরকে সাঁতার শেখানোর একটা ব্যবস্থা করনো যায়, অভিভাবকেরা যদি সচেতন হয়। অভিভাবক নিয়ে যদি গোসল করতে যায়- তাহলে অনেকটা কমে আসবে দুর্ঘটনা।’
ডাকাতিয়া নদীতে মৃত্যুর হার কমাতে শিগগিরই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা নির্ধারণ করে জনসচেতনতা কার্যক্রম ও শিশুদের সাঁতার শেখানোর উদ্যোগ নেয়ার আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান।
তিনি জানান, ‘আমরা এই ক্ষেত্রে দুই ধরণের কার্যক্রম শুরু করবো ইনশাল্লাহ। প্রথমটি হচ্ছে ডাকাতিয়া নদীতে এসেস করা যে, এখানে কোন জায়গাটা বেশি ঝুঁকিপূণ, সেই জায়গাটা ঝুঁকির মাত্রানুযায়ী নির্ধারণ করা, সেনুযায়ী ওই এলাকাটা জনসচেতনতা মূলক কার্যক্রম করা। দুই নম্বর হচ্ছে, আমাদের শিশুরা আসলে এখন সাঁতার শেখার সুযোগ পাচ্ছে না, তো সাঁতার শেখার সুযোগ যেন পেতে পারে আমরা সেটা ইনশিউর করার ব্যবস্থা করবো। ‘
ডাকাতিয়া নদীতে মৃত্যুর হার কমাতে জনসচেতনতা ও মাইকিংয়ের পাশাপাশি নদী পাড়ে মানুষের বিকল্প পানির ব্যবস্থার দাবী সচেতন মহলের।



























