
ছোট দলগুলোর নজর সংসদের উচ্চকক্ষে


ভোটের মাঠে খুব একটা সুবিধা করতে না পারলেও নতুন সংসদের উচ্চকক্ষে যাতে জায়গা পাওয়া যায় সেদিকেই নজর এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের। বিশেষ করে ছোট ও মধ্যম হিসাবে পরিচিত দলগুলোর মধ্যে এ ধরনের চেষ্টা বেশি। কারণ ভোটের মাঠে তাদের শক্তি-সামর্থ্য কম থাকলেও ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে তারা টিকে থাকতে চায়। আর এজন্যই এখন সারা দেশে আনুপাতিক হারে (পিআর) পাওয়া ভোটের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে চান তারা। সূত্রমতে, এমন পরিকল্পনা নিয়েই দলগুলো নেমেছেন এবারের নির্বাচনি যুদ্ধে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে তাদের এমন মনোভাবের কথা জানা গেছে।
পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবিতে জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দল গত বছর বেশ কয়েক মাস আন্দোলন করে। পরে সংসদের উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিনে জুলাই সনদের পক্ষে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। এই ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নিম্নকক্ষের পাশাপাশি জাতীয় সংসদে প্রথমবার যুক্ত হবে উচ্চকক্ষ। তবে এর আগে নির্বাচিত সংসদের সদস্যরা ১৮০ কর্মদিবসের মধ্যে সংবিধানে এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনবেন। এর পরপরই আনুপাতিক হারে (পিআর) বিভিন্ন দল মনোনীত ১০০ আসনের সদস্যদের নিয়ে গঠন করা হবে উচ্চকক্ষ; যার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার ৫৪ বছরের মাথায় দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় শাসনব্যবস্থার যুগে প্রবেশ করবে বাংলাদেশ।


রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় এলাকায় মূলত লড়াই হবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে। এছাড়া বিভিন্ন আসনে বিএনপি-জামায়াতের ছাড় দেওয়া শরিকরাও ভোটের মাঠে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল ধারণা করছেন। এছাড়া জাতীয় পার্টি এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও বেশ কিছু আসনে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনের বিষয়ে আশাবাদী। তবে বড়দের দাপটের কাছে পিছিয়ে থাকবে ছোট ও মাঝারি দলগুলো। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের যুগে দেশ প্রবেশ করলে আনুপাতিক হারে ভোটের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষে জায়গা পাওয়ার একটা সম্ভাবনা রয়েছে তাদের।
এ প্রসঙ্গে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, উচ্চকক্ষ গঠিত হলে বড় দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে কথায় কথায় সংবিধান সংশোধন করতে পারবে না। তাদের উচ্চকক্ষে জবাবদিহি করতে হবে। পিআর পদ্ধতিতে সুবিধা হলো; ছোট দল এক শতাংশ ভোট পেলেও তাদের একজনের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট এই উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। এর ফলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেসব দলের প্রার্থীরা জয়ী হয়ে আসতে পারবেন না, কিন্তু দলের প্রার্থীরা সবাই মিলে সারা দেশে যে ভোট পাবেন-তাতে হয়তো উচ্চকক্ষে তাদের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ মিলতে পারে।
তিনি জানান, গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট ‘হ্যাঁ’সূচক হলে আগামী সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। এই প্রতিনিধিরা প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবে। সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে।
এ প্রসঙ্গে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু যুগান্তরকে বলেন, পিআর পদ্ধতিতে দলগুলোর লাভ-ক্ষতির চেয়েও বেশি হিসাব করা দরকার এতে দেশের এবং গণতন্ত্রের লাভ হবে কিনা। আমি মনে করি এতে দেশ এবং গণতন্ত্র বেশি লাভবান হবে। নতুন উদীয়মান ও সম্ভাবনাময় দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব পিআরের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে পারে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক আশরাফ আলি আকন বলেন, উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি চালু হলে ছোট এবং মধ্যম সারির দলগুলো লাভবান হবে। উচ্চকক্ষে যেহেতু আসন সংখ্যা ১০০ সেহেতু যদি কোনো দল প্রদত্ত ভোটের ১% ভোট পায় তাহলে ওই দলও উচ্চকক্ষে একটি আসন পাবে। সেক্ষেত্রে তারা নিম্নকক্ষে কোনো আসন না পেলেও প্রাপ্ত ভোটের রেকর্ডের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষে আসন পাবে। এতে সবাই দেশ পরিচালনায় অবদান রাখার সুযোগ পাবে। এই পদ্ধতি দেশের জন্য ভালো হবে বলেই তো আমরা ঐকমত্য কমিশনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
এবারের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) নিবন্ধিত ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে বিএনপি ২৮৮, জামায়াত ২২৪, ইসলামী আন্দোলন ২৫৩ এবং জাতীয় পার্টি ১৯২ আসনে সরাসরি ভোটযুদ্ধে অংশ নিচ্ছে। বিএনপি ও জামায়াত তাদের শরিক দলের জন্য কিছু আসনে ছাড় দিয়েছে। তবে বনিবনা না হওয়ায় শেষ মুহূর্তে এসে জামায়াতের জোট থেকে বেরিয়ে এসে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ইসলামী আন্দোলন। বিগত তিনটি সংসদে বিরোধী দলের আসনে থাকা জাতীয় পার্টি এবারই প্রথম এককভাবে ভোটের পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলটি প্রথমবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোট করে। এর পরের দুটি নির্বাচনে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনে অংশ নেয়।
এই চারটি রাজনৈতিক দলের বাইরে কিছু আসনে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা, আবার কিছু আসনে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার বাইরেও এককভাবে ভোটযুদ্ধে নেমেছে কয়েকটি রাজনৈতিক দল। তাদের অন্যতম প্রধান চাওয়া সারা দেশে দলের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা বাড়ানো। আবার কয়েকটি দল সে ফ নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নেমেছে নির্বাচনে। প্রাপ্ত ভোটের পরিবর্তে ইসির নিবন্ধন টিকিয়ে রাখাই তাদের একমাত্র চাওয়া।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতা না হওয়ায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি ২৬, গণফোরাম ১৯, নাগরিক ঐক্য ১১, বাংলাদেশ লেবার পার্টি ১৫টি আসনে এককভাবে নির্বাচন করছে। বিএনপি একটি করে আসনে ছাড় দিলেও বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ৭, গণঅধিকার পরিষদ-জিওপি ৯০ এবং গণসংহতি আন্দোলন ১৭টি আসনে ভোট করছে। একইভাবে জামায়াতের সঙ্গে জোটে থেকে আসন সমঝোতার পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি ৩২, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ৩০, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি ১২, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৩৪, খেলাফত মজলিস ২১ আসনে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দলগুলোর মূল চাওয়া সারা দেশে তাদের প্রাপ্ত ভোটের হার বাড়ানো বা দেখানো। এর বাইরে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি ৬৫, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ ৩৯, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-বাংলাদেশ জাসদ ১১, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল- (মার্কসবাদী) ২৯, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট ২০, জাতীয় পার্টি-জেপি ১০, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ ১৯, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ২৬, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপি ২৩, বাংলাদেশ কংগ্রেস ১৮, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ ৪২, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি-বিএসপি ১৯, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি-বিআরপি ১২, জনতার দল ১৯, আমজনতার দল ১৫, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ১৩, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ৮, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট-বিএনএফ ৮, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএম ৮, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি-বিএমজেপি ৮ এবং জাকের পার্টি ৭ আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোটের মাঠে রয়েছে।
এছাড়া জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ ৬, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল ৬, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি ৫, গণফ্রন্ট ৫, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ৪, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি ৩, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ৩, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি ২, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- বাংলাদেশ ন্যাপ ১, গণতন্ত্রী পার্টি ১, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ১, ইসলামী ঐক্যজোট ১, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা ১ এবং বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টি-বিইপি ১ আসনে প্রার্থী দিয়েছে। জানা গেছে, এই দলগুলো মূলত নিজেদের অস্তিত্ব এবং ইসিতে নিবন্ধন টিকিয়ে রাখতেই নামমাত্র ভোটযুদ্ধে আছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এর তিন দিন পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়। নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস হন এই সরকারের প্রধান। তিনি দায়িত্ব নিয়েই প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য একটি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করেন। ওই বছরেরই ১১ সেপ্টেম্বর থেকে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর তৈরি হয় জুলাই সনদ। ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় এই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা জুলাই সনদের প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। ২৫টি রাজনৈতিক দল ও জোট এতে স্বাক্ষর করে। জুলাই সনদে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে বা পিআর পদ্ধতিতে ১০০ আসনের উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে একমত হয় বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল।








