
করোনায় সুস্থ্যের পর বাবাকে নিয়ে ছেলের সচেতনতা পোস্ট


ঈদুল আযহার দিন চলে গেলেন চাঁদপুরের শিক্ষাবিদ শহীদুল্লাহ মাস্টার। তার ছেলে আছেন অস্ট্রেলিয়ায়। সেখানে কিডনী রোগের উদ্ভাবনী নিয়ে গবেষণা করেন। নাম আবু আলী ইবনে সিনা।
গত ১৪ জুন আবু আলী ইবনে সিনার ফেসবুকে লিখেছেন-
আলহামদুলিল্লাহ| বাবা করোনা মুক্ত হয়ে হসপিটাল থেকে বাসায় ফিরেছেন| গতকাল রাতে ওনার সাথে কথা বলার ছবি|


সবার সচেতনতার জন্য এই কঠিন সময়ের গল্পটি শেয়ার করছি|

গত ১৪ দিন ধরে অসম্ভব মানসিক স্ট্রেসের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে| স্কয়ার হসপিটালে বাবা গিয়েছিলেন শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে ডাক্তার দেখাতে| ডাক্তার কিছু টেস্ট দিয়ে বললেন আপনার হসপিটালে ভর্তি লাগতে পারে তাই কোভিড টেস্ট করে রাখতে| আমরা টেস্ট করাইনি কারণ হসপিটালে ভর্তি না হয়ে বাসায় থাকাটাই নিরাপদ ভেবেছিলাম| কিন্তু পরদিন রিপোর্ট দেখে ডাক্তার বললেন ইউরিনে খুব বেশি ইনফেকশন এবং কিডনি তে সমস্যা তাই দ্রুত হসপিটালে এডমিট হতে বললেন| এদিকে করোনা টেস্ট করাইনি বলে ডাক্তার খুব রাগ করলেন কারণ টেস্ট ছাড়া ভর্তি নিবেনা| তবে তিনি উপায় বের করে দিলেন| তার পরামর্শ অনুযায়ী সাথে সাথে বাবাকে স্কয়ারের সিসিইউ তে ভর্তি করানো হলো যেখানে একমাত্র টেস্ট ছাড়া ভর্তি সম্ভব| ভর্তির সাথে সাথে তারা কিডনি আর ইউরিনের চিকিৎসা শুরু করে দিলেন আর কোভিড টেস্টের স্যাম্পল নিলেন| আমরা করোনা নিয়ে খুব একটা চিন্তিত ছিলাম না কারণ উনি বাসা থেকে খুব একটা বের হননি গত কয়েকমাসে| কিন্তু দুৰ্ভাগ্যজনক ভাবে করোনা পজিটিভ আসায় আমরা অনেকটা মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ি| কারণ ওনার কিডনি আর ইউরিনের সমস্যার সাথে করোনা হওয়াতে পরিস্থিতি খারাপ এর দিকে যাওয়াটা সহজ ছিলো| সাথে সাথে ওনাকে স্কয়ারের করোনা ইউনিটে ভর্তি করানো হলো| ওনার কাছে মোবাইল না থাকায় প্রথম দুই দিন ঠিকভাবে জানতেই পারিনি কি অবস্থায় আছেন|

আমার বন্ধু হেলাল স্কয়ার এ চাকুরী করে তার মাধ্যমে শুধু কিছুটা জানতে পেরেছি| এর মধ্যে দ্বিতীয় দিন হসপিটাল থেকে ফোন করে জানায় যে রোগী ভালো আছেন কিন্তু অল্প অক্সিজেন লাগছে| অক্সিজেন লাগছে শুনে আরো ভয় পেয়ে যাই কারণ অক্সিজেন লাগা মানে হয়তো ফুসফুস আক্রান্ত হয়েছে এবং কিছুটা শ্বাসকষ্ট হচ্ছে| যাই হোক তৃতীয় দিন হেলাল একজন ওয়ার্ডবয়ের মোবাইল থেকে আমাদের সাথে ভিডিও কলের সুযোগ করে দেয়| তারপর থেকে কিছুটা স্বস্তি মেলে| পরদিন মোবাইল দিয়ে আসার পর আর যোগাযোগে সমস্যা হয়নি আর হসপিটাল থেকেও নিয়মিত আপডেট জানিয়ে দিতো| এর মধ্যে ওনার অবস্থা সম্পূর্ণ স্টেবল ছিলো| সিটি স্ক্যান করে ফুসফুসে কোন সংক্রমণ পাওয়া যায়নি| ডাক্তার রা ধারণা করেছে করোনা ফুসফুসে না গিয়ে কিডনি বা শরীরের অন্য কোন জায়গায় সংক্রমিত হয়েছে| আর সঠিক সময়ে চিকিৎসা পাওয়ার কারণে উনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠেছেন| এইরকম সময়ে প্রতিটা সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ন| আমার মা অনেকের নিষেধ সত্ত্বেও সঠিক সময়ে ওনাকে চাঁদপুর থেকে ঢাকায় এনে ডাক্তার দেখিয়েছেন বলেই উনি চিকিৎসা পেয়েছেন দ্রুত| অবশেষে ১৩ দিনের মাথায় করোনা নেগেটিভ আসার পর ওনাকে হসপিটাল থেকে রিলিজ দেয়া হলো| এই কঠিন সময়ে আমার বাবা আর মা এর পাশে সর্বক্ষণ পাশে ছিলেন আমার মামা| বাবা করোনা পজিটিভ নিয়ে তো হসপিটালে ছিলেন| কিন্তু আমার মা র ও কাঁশি ও হালকা জ্বর থাকায় আমরা ধারণা করেছিলাম ওনার ও হয়তো করোনা পজিটিভ আসতে পারে| এই সময়ে মামা নিজের কথা চিন্তা না করে সার্বক্ষণিক মা এর পাশে ছিলেন এবং মা কে নিয়ে হসপিটালে গেছেন তাদের দুইজনের করোনা টেস্টের জন্য| ভাই বোনের ভালোবাসা যে কি অনন্য হয় তা আমার মা আর মামা কে দিয়ে দেখেছি| যাই হোক মা ও মামা দুইজনের করোনা রিপোর্ট নেগেটিভ আসাতে কিছুটা স্বস্তি মিলেছে| মামা Aftabul Sukkur ও Jumrat Sultana Shampa মামীর প্রতি কৃতজ্ঞতার কোন শেষ নেই| এই বিপদের সময়ে যখন সন্তান করোনা আক্রান্ত মা কে জঙ্গলে ফেলে যায়, সেই সময়ে মামী মামাকে আমার মা ও বাবার সেবায় দিয়ে নিজে একাই সন্তানদের নিয়ে সামলেছেন সবকিছু| হয়তো মামার সাথে দেখাও হয়নি কোন কোন দিন তার পরেও কোন অভিযোগ করেননি| আর একজনের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতার কথা না বললেই নয়| সে আমার বন্ধু হেলালMd Helal Khan| তার স্কয়ারে চাকুরীর সুবাদে সে বাবাকে ডাক্তার দেখানো থেকে শুরু করে হসপিটালে ভর্তি, ভর্তির পর ডাক্তার ও আমাদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ মিলে তার সর্বোচ্চ দিয়ে সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছে| স্কয়ার হসপিটালের ডাক্তার তৌহিদুজ্জামান এর প্রতিও কৃতজ্ঞতা| ওনার সঠিক পরার্মশ ও সহায়তার কারণেই এই বিপদ থেকে রক্ষা হয়েছে| এছাড়াও Nurjahan Begum আপা, মাসুম ভাই, Siddiqur Rahman ভাই, Mehedul Karim ভাই, Ovi Haque, Farhana Hridi, Md. Amdad ও আওয়ালীগের নেতৃবৃন্দের প্রতি কৃতজ্ঞতা যারা খোঁজ নিয়েছেন ও বিভিন্ন ভাবে সহায়তা দিয়েছেন|

স্কয়ার হসপিটালে বাবা মোট ১৪ দিনের মতো ছিলেন| যদিও আমি ওখানে ছিলাম না কিন্তু বাবা, মামার সাথে কথা বলে আমার মনে হয়েছে তারা অত্যন্ত ভালো সার্ভিস দিয়েছে| হসপিটালের খাবার সাধরণত ভালো হয়না কিন্তু তারা উন্নত মানের খাবার দিয়েছে| পরিবারের কারো থাকার সুযোগ ছিলোনা এবং বাবা একা ছিলেন, কিন্তু করোনা ইউনিটের ডাক্তার, নার্স ও ব্রাদার রা অত্যন্ত ভালো সেবা দিয়েছেন| নিয়মিত টেস্ট থেকে শুরু করে আমাদের অনুপস্থিতিতে ওনাকে সুস্থ রাখার জন্য যা যা করা দরকার সেটার সর্বোচ্চ চেষ্টা তারা করেছেন| করোনা আইসোলেশন ইউনিটে থাকার কারণে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা অতিরিক্ত বিল দিতে হয়েছে| সেই সাথে প্রতিদিন বিভিন্ন টেস্ট এর কারণে এই তেরো দিনে প্যাথলজি বিল এসেছে প্রায় ২ লাখ টাকা| কিন্তু বিল বেশি আসলেও আমি মনে করি এই টেস্ট গুলো দরকারি ছিলো| সবকিছু মিলিয়ে স্কয়ার হসপিটাল কর্তৃপক্ষ, তাদের ডাক্তার, নার্স ও সকল স্টাফদের প্রতি কৃতজ্ঞতা তাদের উন্নত সেবার জন্য|
সবশেষে দেশের এই দুর্যোগে সময়ে ডাক্তার, নার্স, হসপিটাল স্টাফসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের সেবায় কাজ করে যাচ্ছেন তাদেরকে স্যালুট|
সবাই সুস্থ থাকুন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন নিরাপদে থাকুন এবং দয়া করে করোনা কে হেলা ফেলা করবেন না|
———————
রোববার সেই বাবার জানাজায় অংশ নিতে অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে আসার কথা রয়েছে।

























