
অদম্য হাফছা আক্তার: হুইলচেয়ার থেকে জাতীয় শিক্ষক সম্মাননার মঞ্চে


শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁকে থামাতে পারেনি। জীবনের শুরুতেই নেমে আসা কঠিন বাস্তবতা, পথের প্রতিবন্ধকতা, সামাজিক কুসংস্কার আর নানা অপবাদকে পেছনে ফেলে অদম্য মনোবল ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে এগিয়ে চলেছেন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার হাফছা আক্তার। শিক্ষকতা, খেলাধুলা, নারী উদ্যোক্তা হিসেবে সাফল্য এবং পরিবার সামলানোর পাশাপাশি এবার তিনি অর্জন করতে যাচ্ছেন জাতীয় পর্যায়ের আরেকটি বড় স্বীকৃতি।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৬ উপলক্ষে জাতীয়ভাবে নির্বাচিত গুণী শিক্ষকদের মধ্যে বিশেষ গুণী শিক্ষক হিসেবে সম্মাননা পেতে যাচ্ছেন শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষক হাফছা আক্তার। জাতীয় পর্যায়ের এই সম্মাননার অংশ হিসেবে নির্বাচিত শিক্ষকদের প্রত্যেককে ২ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সনদপত্র দেওয়ার কথা রয়েছে। জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি ইতোমধ্যে ৯৫ জন গুণী শিক্ষককে চূড়ান্ত করেছে। তাঁদের মধ্যে হাফছা আক্তার একজন।
হাফছা আক্তারের এই দীর্ঘ পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতি (বিপিকেএস)-এর। প্রতিষ্ঠানটির স্থানীয়ভাবে নিবন্ধিত স্ব-সংগঠন ‘চাঁদপুর ডিজএ্যাবল্ড পিপলস্ অর্গানাইজেশন টু ডেভেলপমেন্ট’ (চাঁদপুর-ডিপিওডি), ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর তাঁর এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।


দুই বছর বয়সেই বদলে যায় জীবন
হাফছা আক্তার ১৯৮৩ সালের ৩ জানুয়ারি চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার শোভান গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দুই ছেলের পর প্রথম মেয়ে হিসেবে তাঁর জন্মে পরিবারে নেমে এসেছিল আনন্দের বন্যা। জন্মের পর প্রায় দুই বছর স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠছিলেন তিনি।
কিন্তু দুই বছর বয়সে হঠাৎ জ্বর ও পাতলা পায়খানায় আক্রান্ত হন হাফছা। অসুস্থতার পর আর আগের মতো হাঁটাচলা করতে পারেননি। ধীরে ধীরে কোমরের নিচের অংশ অকার্যকর হয়ে পড়ে। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা থাকলেও তাঁর চিকিৎসায় কোনো ত্রুটি রাখা হয়নি।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তাঁকে বাড়ির পাশের শোভন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়। বিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথে প্রায়ই পড়ে যেতেন তিনি। তবুও থেমে থাকেননি। এভাবেই পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করেন।
তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে উচ্চ বিদ্যালয়ে
প্রাথমিক শিক্ষা শেষে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের প্রত্যাশী আর এ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন হাফছা। তাঁর শারীরিক অবস্থা দেখে শুরুতে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু তাঁর অধ্যবসায়, সাহস ও অদম্য মনোবল খুব দ্রুত শিক্ষক ও সহপাঠীদের মনোভাব বদলে দেয়।
সবার সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে পড়াশোনা চালিয়ে যান। ১৯৯৯ সালে এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে তখন থেকেই ছাত্রছাত্রী পড়ানো শুরু করেন তিনি।
এরপর ভর্তি হন ফরক্কাবাদ ডিগ্রি কলেজে। বাড়ি থেকে কলেজের দূরত্ব ছিল প্রায় ছয় কিলোমিটার। ২০০১ সালে দ্বিতীয় বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ভর্তি হন ফরিদগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে। এবার বাড়ি থেকে কলেজের দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার।
দীর্ঘ এই পথ কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো ট্রেক্সি বা টেম্পুতে করে পাড়ি দিতে হয়েছে তাঁকে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা এবং দীর্ঘ যাত্রার কষ্টও তাঁর শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ২০০৫ সালে বি.এস.এস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন তিনি।
জাপানে বিশ্বজয়
হাফছা আক্তারের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি ২০০৫ সাল। ওই বছর জাপানের নাগোয়া সিটিতে অনুষ্ঠিত হ্যান্ডি ম্যারাথন বা হুইলচেয়ার দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেন তিনি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ২৫১ জন প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন হাফছা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে শক্তিতে পরিণত করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পতাকাকে তুলে ধরেন তিনি।
তাঁর এই সাফল্য প্রমাণ করে—সুযোগ পেলে শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারেন।
শিক্ষকতার মাধ্যমে নতুন স্বপ্ন
২০০৬ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন হাফছা আক্তার। কর্মস্থল ছিল তাঁর বাড়ি থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে। প্রতিদিন কিছুটা পথ পায়ে হেঁটে, এরপর বাস কিংবা অন্য যানবাহনে করে কর্মস্থলে যেতে হতো তাঁকে।
শিক্ষকতা তাঁর কাছে শুধু একটি চাকরি নয়; এটি মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার একটি মাধ্যম। নিজের জীবনের সংগ্রাম থেকেই তিনি বুঝেছেন শিক্ষার শক্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
এর পাশাপাশি তিনি নারী উদ্যোক্তা হিসেবেও কাজ করেছেন। পরিবার সামলানোর পাশাপাশি নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছেন। একজন শিক্ষক, নারী উদ্যোক্তা ও পরিবারের অভিভাবক হিসেবে বিভাগীয় পর্যায়ে জয়িতা পুরস্কার অর্জন করেছেন তিনি।
বিয়ের পরও থামেনি সংগ্রাম
২০০৭ সালে চাঁদপুর সদর উপজেলার শকদি গ্রামের মো. নাছির উদ্দিনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন হাফছা। তাঁদের দুই সন্তান—এক ছেলে ও এক মেয়ে।
শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে বিয়ের পরও তাঁকে নানা অপবাদ, কুসংস্কার ও সামাজিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু কোনো কিছুই তাঁর আত্মবিশ্বাসকে ভেঙে দিতে পারেনি। বরং প্রতিটি বাধাকে অতিক্রম করে আরও দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে গেছেন তিনি।
সংসার, সন্তান, চাকরি ও সামাজিক দায়িত্ব—সবকিছুর পাশাপাশি নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছেন হাফছা।
‘দয়া নয়, সুযোগ চাই’
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে হাফছা আক্তার বলেন, চাকরির পাশাপাশি তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে চান। তাঁর সবচেয়ে বড় লক্ষ্য, তাঁর মতো সমাজে অবহেলিত, ভাগ্যবঞ্চিত ও প্রতিবন্ধী মানুষদের শিক্ষার মাধ্যমে উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসা।
তিনি বলেন, ব্যক্তি ও পরিবারের উন্নয়নের পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। এ জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন।
হাফছা আক্তারের বক্তব্যে উঠে আসে আত্মমর্যাদার দৃঢ় প্রত্যয়—প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের করুণা নয়, প্রয়োজন সুযোগ।
তিনি বলেন, “দেশ আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। এবার দেশের উন্নয়নে আমি কিছু করতে চাই। জানি না কী করতে পারব, তবে চেষ্টা করে যাব। প্রতিবন্ধীদের কেউ দয়ার চোখে না দেখে তাদের সমাজের মূল স্রোতধারায় আসার সুযোগ দিন। দেখবেন, তারা একদিন এ দেশকে অনেক কিছু দেবে।”
অনুপ্রেরণার নাম হাফছা
হাফছা আক্তারের জীবন যেন একটি দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প—যেখানে শারীরিক সীমাবদ্ধতা বারবার সামনে এসেছে, কিন্তু প্রতিবারই তা অতিক্রম করেছেন তিনি।
দুই বছর বয়সে হাঁটার সক্ষমতা হারানো সেই শিশুটি একদিন হুইলচেয়ারে বসেই জাপানের মাটিতে বিশ্বজয় করেছেন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন, সংসার ও সন্তান সামলেছেন, নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন এবং জয়িতা পুরস্কার পেয়েছেন।
এবার জাতীয় শিক্ষক দিবসের বিশেষ গুণী শিক্ষক সম্মাননার জন্য নির্বাচিত হয়ে তাঁর সংগ্রামী জীবনের মুকুটে যুক্ত হতে যাচ্ছে আরেকটি গৌরবের পালক।
হাফছা আক্তারের গল্প শুধু একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষকের সাফল্যের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের প্রতিটি প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য একটি বার্তা—সুযোগ পেলে শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়, মানুষের যোগ্যতাই হয়ে উঠতে পারে তার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
লেখক: নাসির উদ্দিন পাঠান, গণমাধ্যম কর্মী ঢাকা।

























