
প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে শিমুল গাছ


কচুয়ায় প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ফাগুনের আগুন ঝরানো উপকারী শিমুল গাছ। আগুন ঝরা ফাগুনে চোখ ধাঁধানো গাঢ় লাল রঙের অপরূপ সাজে সজ্জিত শিমুল গাছ আগের মতো এখন আর চোখে পড়ে না। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবসহ নানা প্রতিকূলতায় ক্রমান্বয়ে এ গাছ হারিয়ে যাওয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবেশের উপর। এ গাছ রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন সচেতন মহল।
জানা গেছে, নানা প্রতিকূলতায় কচুয়া উপজেলা থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে নানা উপকারী শিমুল গাছ। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এ গাছের যথেষ্ট ভূমিকা থাকলেও এ গাছ রক্ষায় কোনো উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্টদের। কচুয়া উপজেলার গ্রামাঞ্চলে এ শিমুল গাছকে অনেকে তুলা গাছ নামেও ডেকে থাকেন। শিমুল গাছের সব অংশেরই রয়েছে ভেষজগুণ। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকরা এখনো নানা রোগের চিকিৎসায় এ গাছের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করে থাকেন। শিমুল গাছ বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতেই কম বেশি দেখা যায়। সাধারণত বীজের মাধ্যমে এর বংশবিস্তার হয়ে থাকে। রোপণের ৫-৬ বছরের মধ্যে শিমুল গাছে ফুল ফোটে। প্রাকৃতিকভাবে তুলার সাথে উড়ে উড়ে ছড়িয়ে পড়া বীজ থেকেই এর জন্ম হয়। আগে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার ধার, মাঠ ও বসতবাড়ির পাশে বড় বড় শিমুল গাছ দেখা গেলেও বর্তমানে বড় গাছ তেমন একটা চোখে পড়ে না।
সুদূর অতীতেও বসন্তের শুরুতেই গ্রামবাংলার আনাচে-কানাচে জন্ম নেয়া ও অনাদরে বেড়ে ওঠা শিমুল গাছের শাখাগুলো বসন্তের আগমনে লাল শাড়ির ঘোমটা পরা গ্রাম্য নববধূর সাজে সজ্জিত হতে দেখা যায়। অন্যান্য গাছের তুলনায় শিমুল গাছ অনেক উঁচু
হওয়ায় বহু দূর থেকে এ মনোরম দৃশ্য চোখে পড়ে। সবুজ বনানীর ভেতরে আগুন রাঙা শিমুল ফুলের বাহারে চোখ জুড়িয়ে যায়।


স্থানীয় শিমুলতলী গ্রামের অধিবাসী মিজানুর রহমান,শাহিন সরকার ও আলম বলেন,শিমুল গাছ সাধারনত, ৯০ থেকে ১০০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে দেখা যায়। সেই তুলনায় মোটাও হয় বেশ। নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে শিমুল গাছ এক দেড়শ’ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। শীতের শেষে পাতা ঝরে পড়ে। এ গাছ অনেক উঁচু হওয়ায় কাক, কোকিল, চিল, বক, কাঠ ঠোকরাসহ বিভিন্ন ধরনের পাখি বাসা বেঁধে বসবাস করত। এ গাছ দিনদিন উজাড় হওয়ার ফলে এসব পাখিরা আবাসস্থল হারিয়ে পড়েছে অস্তিত্ব সংকটে। গাছ না থাকায় আবাসস্থলের অভাবে ধীরে ধীরে এসব পাখিরা হারিয়ে যাচ্ছে এলাকা থেকে। এখন আর আগের মতো শিমুল গাছ দেখা যায় না।
সেঙ্গুয়া গ্রামের অধিবাসী আলাউদ্দিন,হারুনুর রশিদ ও জাকির মিয়াজী জানান, বসন্তের শুরুতেই শিমুল গাছে ফুল ফোটে। চৈত্র মাসের শেষের দিকে ফল পুষ্ট হয়। বৈশাখ মাসের দিকে ফলগুলো পেকে শুকিয়ে গিয়ে বাতাসে আপনা আপনিই ফল ফেটে তুলায় আটকে থাকা বীজ বেরিয়ে বাতাসে উড়ে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। একটি বড় আকারের শিমুল গাছ থেকে বছরে গড়ে প্রায় ১০-১২হাজার টাকার তুলা পাওয়া যায় কিন্তু আমাদের গ্রামে তেমন একটা শিমুল বা তুলা গাছ দেখা যায় না।
উপজেলার পালাখাল বাজারের লেপ-তোষক ব্যবসায়ী লোকমান হোসেন জানান, শুনেছি বিগত সত্তরের দশকেও প্রতি মণ শিমুল তুলা ২শ থেকে ৩শ টাকায় বিক্রি হতো। কিন্তু বর্তমান বাজারে শিমুল তুলা প্রায় নয় হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। সারা বছর নানা কাজে ব্যবহারের জন্য ব্যাপক হারে এ গাছ কাটা হলেও সেই তুলনায় রোপণ না হওয়ায় গাছের সংখ্যা কমছেই। বর্তমানে বড় গাছ সচরাচর চোখে পড়ে না। কৃষি ও বন বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের শিমুলগাছের বংশবৃদ্ধির হার কিভাবে বাড়ানো যায় সে বিষয়ে নজর রাখার আহ্বান সচেতন মহলের।
কচুয়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার মো. জাহাঙ্গীর আলম লিটন বলেন, বানিজ্যিকভাবে এখন দেশের কোথাও এই শিমুলগাছ বা তুলা চাষ করা হয় না। এটি প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠে। যার কারণে শিমুলগাছ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। এর
তুলাটা খুবই ভাল এটি বাণিজ্যিকভাবে চাষ হলে মানুষ আসল তুলার মর্ম বুঝতে পারতো। বর্তমানে যেভাবে শিমুল গাছ উজাড় হচ্ছে তাতে করে এ গাছ রক্ষায় এখনই ব্যবস্থা না নিলে এক সময় উপকারী গাছের তালিকা থেকে এ গাছটি হারিয়ে যাবে।




























