
হাজীগঞ্জ থানার জাগদল ও বিএনপির জন্মের ইতিহাস

১৯৭৮ সালে মরহুম আশেক আলী মাস্টার সাহেব হাজীগঞ্জ থানার ভাসানী ন্যাপের প্রেসিডেন্ট ছিলেন আর আমি ছিলাম ভাসানী ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক । ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রেসিডেন্ট মরহুম বিচারপতি আব্দুর সাত্তারকে আহ্বায়ক করে মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জাগদল গঠন করেন । চাঁদপুর জেলার জাগদলের আহ্বায়ক করেন চাঁদপুর মহিলা কলেজের প্রিন্সিপাল ক্যাপ্টেন আব্দুল করিম উদ্দিন সাহেবকে । মরহুম ক্যাপ্টেন করিম উদ্দিন সাহেব পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমীতে মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শিক্ষক ছিলেন ।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সাহেব ক্যাপ্টেন করিম উদ্দিন সাহেবকে দল গঠনের দায়িত্ব দেন । তখন জাগদলের জেলা যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন অ্যাডভোকেট শাহ্ মোঃ ওবায়দুল্লাহ । শাহ্ মোঃ ওবাইদুল্লাহ আমাদের সাথে ভাসানী ন্যাপ করতেন । ক্যাপ্টেন করিম উদ্দিন সাহেব শাহ্ মোঃ ওবায়দুল্লাহ সাহেবকে দিয়ে আমাকে আর আশেক আলী মাস্টারকে ক্যাপ্টেন করিম উদ্দিন সাহেবের বাসায় ডেকে নেন । করিম সাহেব আমাকে আর আশেক আলী মাস্টারকে অনুরোধ করেন জাগদলে যোগ দেওয়ার জন্য । করিম উদ্দিন সাহেবের অনুরোধে আমি আর আশেক আলী মাস্টার জাগদলে যোগ দেই ।
মরহুম আশেক আলী মাস্টার হলেন হাজিগঞ্জ থানা জাগদলের আহ্বায়ক এবং আমি হলাম হাজিগঞ্জ থানার এক নম্বর যুগ্ম-আহ্বায়ক । ১৯৭৮ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর জাগদল,মুসলিম লীগ, ইউপিপি ও ইসলামিক ঐক্য ফ্রন্ট নিয়ে মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সাহেব বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করেন । তখন চাঁদপুর জেলার বিএনপির আহ্বায়ক করা হয় ক্যাপ্টেন করিম উদ্দিন সাহেবকে । আমি এবং মরহুম আশেক আলী মাস্টার হাজীগন্জ থানায় বিএনপি গঠন করার জন্য প্রস্তুুতি নেই ।


আমি প্রস্তাব দিয়েছিলাম মরহুম আশেক আলী মাস্টারকে হাজীগঞ্জ থানা বিএনপি’র আহ্বায়ক হওয়ার জন্য । আমি আশেক আলী মাস্টার সাহেব কে বললাম, “আপনি হাজীগঞ্জ থানার বিএনপির আহ্বায়ক হন আর আমি যুগ্ম-আহ্বায়ক হই “। তখন আশেক আলী মাস্টার সাহেব বললেন, “নতুন দল গঠন করতে হলে আহ্বায়কের অনেক দায়িত্ব । তাকে অনেক সময় ও অর্থ প্রদান করতে হয় । আমি শিক্ষকতা করি । আমার পক্ষে সময় ও অর্থ দুটোই সমানভাবে প্রদান করা সম্ভব না । আমি শুধু সদস্য হয়ে থাকবো “। তিনি আরো বললেন, “বাচ্চু,তুমি আহ্বায়ক হও । তার কথা মতে, আমি হাজিগঞ্জ থানার বিএনপি’র আহবায়ক হই এবং মরহুম কলিমুল্লাহ মিয়াজী দলের ক্যাশিয়ার হন ।
১৯৭৮ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান । হাজিগঞ্জ থেকে ১৪ জন নমিনেশন চান । তার মধ্যে সাদ্রার দলিলুর রহমান অ্যাডভোকেট,বি এম কলিমুল্লাহ,আব্দুল হাই চেয়ারম্যান,আব্দুল গনি হেডমাস্টার (শাহরাস্তি) এবং এম এ মতিন এমপি রয়েছেন । এম এ মতিন সাহেব ১টাকা দিয়ে আমার কাছ থেকে সদস্যপদের রশিদ নেন । বাকি যারা প্রার্থী ছিলেন তারা সবাই আমাকে ১টাকা দিয়ে আমার কাছ থেকে সদস্যপদের রশিদ নেন । ১৯৭৮ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মরহুম এম এ মতিন সাহেব কে বিএনপি থেকে নমিনেশন দেয়া হয় । নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মরহুম আব্দুর রব সাহেবকে ৩ হাজার ভোটে পরাজিত করে মরহুম এম এ মতিন সাহেব এমপি নির্বাচিত হন ।
১৯৭৯ সালের ১৯ ই মে এম পি মতিন সাহেব হাজীগন্জ থানার বিএনপির সম্মেলনের জন্য আহ্বান করেন । ১৮ ই মে রাত ৮ টায় আমি,মতিন সাহেব এবং কলিমুল্লাহ মিয়াজী কমিটির পদ নিয়ে মতিন সাহেবের পোলের গোড়ার উত্তর পাশের গোদির ঘরে বসি। মতিন সাহেব রামপুরের জুনাব আলী মাস্টারকে হাজিগঞ্জ থানার বিএনপি’র প্রেসিডেন্ট এবং আমাকে সেক্রেটারি হওয়ার জন্য প্রস্তাব দেন । আমি এম এ মতিন সাহেবের সাথে সহমত পোষণ করতে পারিনি । আমি সভাপতি হিসেবে আশেক আলী মাস্টার সাহেবের নাম প্রস্তাব দেই । কিন্তুু এম এ মতিন সাহেব এটা কিছুতেই মানতে রাজি হননি । কারণ,তিনি আশেক আলী মাস্টারকে পছন্দ করতেন না ।
তারপর চূড়ান্ত হলো জুনাব আলী মাস্টার সভাপতি,সিনিয়র সহ-সভাপতি অধ্যাপক জাকির হোসেন মজুমদার,আমি সাধারণ সম্পাদক এবং কলিমুল্লাহ মিয়াজী ক্যাশিয়ার হবেন । ১৯ই মে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল হাজীগন্জ পাইলট হাইস্কুলের দোতলায় বিকাল তিনটায় । সর্বসম্মতিক্রমে জুনাব আলী মাস্টার সভাপতি,সিনিয়র সহ-সভাপতি অধ্যাপক জাকির হোসেন মজুমদার,আমি সাধারণ সম্পাদক এবং কলিমুল্লাহ মিয়াজী ক্যাশিয়ার হলেন । জুনাব আলী মাস্টার সাহেব তখন সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন না । আমি পরদিন জুনাব আলী মাস্টারের বাড়িতে গিয়েছিলাম উনার দস্তরখৎ আনার জন্য ।
উনি আমাকে বললেন,”বাচ্চু, আমি কোনো পদে যাবো না”। আমি এসে মতিন সাহেবকে ঘটনাটি জানালাম । মতিন সাহেব আমাকে বললেন,”চুপ থাকো”। তারপর আমি মনে মনে ভাবলাম যদি কোনো সদস্য একাধারে ৩টি মিটিং এ অনুপস্থিত থাকেন তাহলে পার্টির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তার পদ চলে যায় । যেহেতু জুনাব আলী মাস্টার প্রথম মিটিং এ অনুপস্থিত ছিলেন এবং কোনো পদ নিতে চাচ্ছেন না,তাই তিনি বাকি মিটিংগুলোতে অনুপস্থিত থাকবেন । ফলে পার্টির গঠনতন্ত্রানুযায়ী তার পদ এমনি চলে যাবে । প্রেসিডেন্ট পদ শূন্য হলে সে মুহূর্তে আমরা আশেক আলী মাস্টারকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিতে পারবো । কারন, প্রেসিডেন্ট পদে আর কোনো প্রার্থী ছিলেন না ।
এরপর আমি ৬ মাসের মধ্যে ৩টি মিটিং ডাকি । জুনাব আলী মাস্টার ৩ মিটিং এর একটি মিটিংয়ে ও উপস্থিত ছিলেন না । ফলে গঠনতন্ত্রানুযায়ী তার প্রেসিডেন্ট পদ চলে যায় । ২ মাস পর আমি আরেকটি মিটিং ডাকি এবং সর্বসম্মতিক্রমে আশেক আলী মাস্টারকে বিএনপির সভাপতি পদে নির্বাচিত করি ।
এটিই হলো হাজীগঞ্জ থানায় বিএনপির জন্মের সঠিক ইতিহাস ।।
হাজীগঞ্জ জাগদল ও বিএনপির গঠন ও প্রতিষ্ঠা ব্যাপারে কেউ কিছু জানতে চাইলে চাঁদপুরের প্রখ্যাত বিএনপি নেতা ও প্রাক্তন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শফিউদ্দিন আহমেদের কাছে জানতে পারবেন ।
নিচের ছবির সাদা দাড়িওয়ালা ভদ্রলোকটি আশেক আলী মাস্টার,সাফারি গায়ে মতিন সাহেব,ম্যাডামের বাম পাশে রঙিন পোশাক ও কোঁকড়ানো চুল আমি।।
আবদুল মান্নান খান বাচ্চু
সাবেক মেয়র- হাজীগঞ্জ পৌরসভা।
প্রতিষ্ঠাতা আহবায়ক- হাজীগঞ্জ উপজেলা বিএনপি ও সাবেক সভাপতি উপজেলা বিএনপি। (সংগৃহীত)

























