জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের ৭৫ বছর পূর্ণ হল ১৬ মে। ১৯৫১ সালের ১৬ মে বাংলাদেশ থেকে চিরকালের জন্য জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করা হয়। এতে প্রজাস্বত্ব আইনের মাধ্যমে কৃষক পুনরায় তার অধিকার ফিরে পায়।
১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশ এদেশে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত অর্থাৎ জমিদারি প্রথা ব্যবস্থা চালু করেন।
লর্ড ছিলেন ইংল্যান্ডের জমিদার পরিবারের সন্তান। তিনি অনুভব করেন রাজস্ব আদায় ঠিক রেখে ব্রিটিশ অনুগত সম্প্রদায় তৈরির জন্য জমিদার প্রথা এদেশে আনতে হবে।
জমির মালিকানা চলে যায় ইংরেজদের অনুগত, বশংদ গোষ্ঠীর হাতে, যারা জমিদার বলে সম্বোধিত হতো। এভাবে ইংরেজরা তাদের এদেশীয় দোসর তৈরি করে যারা উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসন দীর্ঘস্থায়ী করতে খুব বড় ভূমিকা রেখেছে।
জমিদারি গুলো অর্থের বিনিময়ে ইজারা দেয়া হতো। সময় মত কোম্পানিকে খাজনা প্রদানের মাধ্যমে বংশানুক্রমে জমিদাররা সেগুলো ভোগ করতে পারতো। কৃষকদের তাদের উৎপাদনের ৪৫% খাজনা হিসেবে জমিদারকে জমা দিতে হতো। আর জমিদারের আদায়কৃত সম্পূর্ণ খাজনার ৯০% রাজস্ব হিসেবে কোম্পানির কোষাগারে যেতো। যদি নির্দিষ্ট দিনের সূর্যাস্তের আগে কোন জমিদার তার খাজনা জমা দিতে ব্যর্থ হতো তার জমিদারি নিলাম করে অন্য কারো হাতে দিয়ে দেয়া হতো। ওই সময় এই আইনের কারণে জমিদারি গুলো প্রচুর হাতবদল হতো।
জমিদারি প্রথার ফলে বাংলায় বুর্জোয়া শ্রেনী তৈরি হয়। এক শ্রেনী অন্য শ্রেনীর প্রভূতে রুপান্তরীত হয়। জমিদাররা অধিকাংশ সময় কৃষকের থেকে বেশি খাজনা আদায় করত, এ সময় কৃষকরা ,যারা এক সময় জমির মালিক ছিলেন তারা দুঃখজনক ভাবে ভূমিদাসে পরিণত হোন। বেশিরভাগ জমিদার তার জমিদারি ও খাজনা আদায় পত্রের দায়িত্ব নায়েব-গোমস্তার হাতে ছেড়ে দিয়ে কলকাতায় বিলাসী জীবনযাপনে মেতে থাকত। ফলে জবাদিহিতা ও অভিভাবকত্বের অভাবে সাধারণ মানুষের জীবন দূর্বিষহ হয়ে যায়। নায়েব-গোমস্তারা ইচ্ছামত অত্যাচার চালাতো কৃষকের ওপর। দেশীয় শিল্পগুলো এ সময় ভেঙ্গে পড়ে, অর্থনীতির মেরুদণ্ড গুড়িয়ে যায়।
এ সময় দেশজুড়ে বিদ্রোহ-আন্দোলন গড়ে উঠতে থাকে। ১৮৫৯-৬১ সালে নীল বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এ ছাড়া ফরায়েজী আন্দোলনের নেতা হাজি শরিয়তউল্লাহ, তার পুত্র দুদুমিয়া ও বাঁশের কেল্লার প্রতিষ্ঠাকারী মীর নিসার আলী ওরফে তিতুমীরের মত মুক্তিকামী ব্যক্তিরাও জমিদারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় লাঠি ধরেছেন। ওই সময় সাধারণ মানুষের জীবন কতটা ভয়ানক ছিল তার কিছুটা জানা যায় মীর মশাররফ হোসেনের বিয়োগান্তক নাটক জমিদার দর্পণ ও দীনবন্ধু মিত্রের নাটক নীলদর্পণ থেকে। এমনকি এই নাটক দুটোও তৎকালীন জমিদারদের ব্যপক বিরোধীতার সম্মুখীন হয়েছে।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের পতনের পর ১৯৪৮ সালের ৩১ মার্চ পুর্ব পাকিস্থানের পার্লামেন্টে প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ নামে বিল পেশ করা হয়। অবশেষে ১৯৫১ সালের ১৬ই মে এই বিল পাশ হয়, যার মাধ্যমে সুদীর্ঘ দেড়শ বছরের কালো জমিদারি প্রথার অবসান ঘটে। এখানে উল্লেখ্য, কিছু কিছু গ্রামে তখনও জমিদারী প্রথা চালু ছিল যা ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার বিলোপ করে, যুক্তফ্রন্ট সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল এটি।
প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ এর মাধ্যমে ১৯৫১ সালের ১৬ মে জমিদারি প্রথা বিলোপ করা হয়। সমস্ত জমি রাষ্ট্র অধিগ্রহণ করে। এর ফলে জমির ওপর কৃষকের অধিকার নিশ্চিত হয়। প্রজাস্বত্ব আইন সাধারণ মানুষের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিজয়, যা অর্থনৈতিক মুক্তি এনে দিয়েছে।