আজ ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫—বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালের এই দিনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়াসে বিএনপির সূচনা করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দলটি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠাকে মৌল নীতি হিসেবে গ্রহণ করে।
প্রতিষ্ঠার পটভূমিঃ
১৯৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও একদলীয় শাসনের অভিজ্ঞতা জাতিকে গভীর সংকটে ফেলেছিল। এই পরিস্থিতিতে জিয়াউর রহমান একটি “বিগ-টেন্ট” রাজনৈতিক দল গঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করেন। বিএনপি তাই জন্মলগ্ন থেকেই বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ধারা ও শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে। ইতিহাসবিদ বার্নার্ড লুইসের মতে, “A political party survives only when it speaks to the aspirations of common people”—এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি জনগণের রাজনৈতিক অধিকার পুনঃস্থাপনের দাবিকে সামনে নিয়ে আসে।
গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকাঃ
১৯৮০-এর দশকে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বিএনপি “প্রহসনের নির্বাচন” আখ্যা দিয়ে বয়কট করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলি রিয়াজ (2019) উল্লেখ করেছেন, এই নির্বাচন বর্জনের মাধ্যমে বিএনপি দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়, যদিও কিছু বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ নেয়। এভাবে বিএনপি জনমতকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে মুক্ত, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমেই জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব।
১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে বিএনপি অন্যান্য বিরোধী দলের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সামরিক শাসক এরশাদকে অপসারণ করে। এর ফলশ্রুতিতে ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়—যা ছিল বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। রাজনৈতিক বিশ্লেষক রওনক জাহান উল্লেখ করেছেন, “The 12th Amendment of 1991, which restored parliamentary democracy, remains one of the most significant achievements of Bangladesh’s party politics.” এই প্রক্রিয়ায় বিএনপির অবদান অনস্বীকার্য।
জনগণের অধিকার ও নির্বাচন ব্যবস্থাঃ
১৯৯৬ সালে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করে—যা জনগণের ভোটাধিকারের নিশ্চয়তা প্রদানে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ ছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট দুই – তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে বিজয়ী হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলি রিয়াজের মতে, “Despite its flaws, BNP has remained a central pillar of Bangladesh’s competitive politics, ensuring that electoral democracy does not collapse into a one-party system.”
তাৎপর্য ও সমালোচনাঃ
বিএনপির রাজনৈতিক ভূমিকা মূলত তিনভাবে গুরুত্বপূর্ণ:
1. সংবিধান ও গণতান্ত্রিক কাঠামোয় অবদান—সংসদীয় পদ্ধতিতে প্রত্যাবর্তনে সমর্থন।
2. নির্বাচনী সংস্কারে ভূমিকা—তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির প্রবর্তন।
3. বিরোধী রাজনীতির ধারাবাহিকতা—২০০৮-পরবর্তী সময়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের গুম, খুন ও হয়রানিমূলক মামলা – হামলা মোকাবেলা করে গণতান্ত্রিক লড়াই অব্যাহত রাখা।
উপসংহার
৪৭ বছরে বিএনপি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনিবার্য অংশে পরিণত হয়েছে। গণআন্দোলন, সাংবিধানিক সংস্কার এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে দলটির ইতিবাচক অবদান যেমন আছে, তেমনি সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনাও রয়েছে। তবুও দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে টেকসই করতে বিএনপি-সহ সব রাজনৈতিক দলের গঠনমূলক ভূমিকা অপরিহার্য। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে আশা করা যায়—বিএনপি গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের জন্য তার ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি আরও দৃঢ়ভাবে পালন করবে।
মোহাম্মদ আরিফ ইমাম
সহকারী অধ্যাপক (ইংরেজি)