আসমান ও জমিন এবং এই দুইয়ের মাঝে যা কিছু বিরাজমান নিরুঙ্কুশভাবে এসবের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, একইসঙ্গে মানবজীবনের আইন-বিধানদাতা মহান আল্লাহর একক অস্তিত্বে বিশ্বাসই হলো তাওহীদ বা একত্ববাদ। সুতরাং সৃষ্টিজগতের এই একক মালিক, ধারক ও বাহক মহান আল্লাহর উপাসনা বা বন্দেগীর পাশাপাশি মানবজীবনের জন্য তাঁর হুকুমাত বা আইন-বিধানকে পুরোপুরি অনুসরণকেই ইবাদত বলা হয় অথবা মহান রবের দাসত্বকে পুরোপুরি স্বীকার করে নেওয়া হয়।
আপনি নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত, কোরবানি বা জিকির-আজকারের মতো আনুষ্ঠানিক কিছু বন্দেগী করলেন, নিজেকে ফরহেজগার মনে করলেন, তাহাজ্জুদ গোজার করলেন। কিন্তু মানবজীবনের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত আইন-বিধানকে ব্যক্তিগত, পরিবার, রাষ্ট্রীয় জীবনে অনুসরণ ও প্রতিষ্ঠা করলেন না, বা তা প্রতিষ্ঠার চেষ্টাই করলেন না। এই বিষয়ে আপনার মধ্যে কোনো তাড়নাও নাই। এর মানে আপনি তাওহীদকে পুরোপুরি অনুসরণ করলেন না। আপনি এক অংশ মানলেন, অপর অংশকে অস্বীকার করলেন, অবজ্ঞা করলেন অথবা অজ্ঞতা থেকে বের হওয়ার চেষ্টাই করলে না।
মহান আল্লাহ আল-কোরআনে বর্ণনা করেন, “তবে কি তোমরা কিতাবের (কোরআন) কিছু অংশে বিশ্বাস আর কিছু অংশকে অবিশ্বাস কর? অতএব তোমাদের যেসব লোক এমন কাজ করে, তাদের প্রতিফল পার্থিক জীবনে লাঞ্ছনা ভোগ করা ছাড়া আর কি হতে পারে? আর কিয়ামতের দিন কঠিনতম শাস্তির দিকে নিক্ষিপ্ত হবে। তারা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ বেখবর নন।” (বাকারাহ-৮৫)
হাককুল্লাহ (একমাত্র আল্লাহর ইবাদত) এবং হাককুল হুকুমাত (আল্লাহ প্রদত্ত আইন-বিধান) দুটির সমন্বয়কেই বলা হয় তাওহীদ। অথ্যাৎ সৃষ্টিকর্তা যিনি, আইন-বিধান বা হুকুমাতের মালিকও তিনি। এক কথায় সৃষ্টিকর্তা যিনি এবং আসমান-জমিন যার, ইবাদত-উপাসনাও তাঁর। একই সঙ্গে জমিনে আইন-বিধানও চলবে তাঁর।
আল্লাহ বলেন, “আর আমি জিন ও মানুষকে কেবলমাত্র আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।” (আল-কোরআন, আয-যারিয়াত- ৫৬)
পবিত্র আল-কোরআনে আল্লাহ আরও বলেন, “নিশ্চয়ই আমি নবীকে হেদায়েত ও দ্বীনে হক (ধর্ম বা পথনির্দেশ ও সত্য জীবনবিধান, মতবাদ, আদর্শ) দিয়ে পাঠিয়েছি। যাতে তিনি এই দ্বীনকে অন্য সকল দ্বীনের (মতবাদ-মতাদর্শের) ওপর বিজয়ী করেন। চাই তা মুশরিকদের কাছে যতই অপছন্দ হোক না কেন।” (আস-সফ-৯)
পবিত্র আল-কোরআনের উল্লেখিত দুটি বাণির আলোকে এক আল্লাহ-ই ইবাদত পাওয়ার যোগ্য এবং তাঁর বিধানই ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিফলিত হওয়ার বিষয়টি সাব্যস্ত। নবী করিম (সা.) আমাদের দেখিয়ে গেছেন কিভাবে আমরা এক আল্লাহর ইবাদত করবো। একইসঙ্গে আল্লাহ প্রদত্ত বিধানকে ব্যক্তি, পরিবার সমাজ তথা রাষ্ট্র বা আল্লাহর জমিনে বাস্তবায়ন করবো। এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় সুন্নাহ। তিনি পৃথিবীতে এমন নজীর স্থাপন করেছেন যা সর্বযুগে, সর্বকালে প্রাসঙ্গিক। ইসলামই মানবতার সৌন্দর্য্য, স্বার্থ সংরক্ষণ ও সভ্যতা নির্মাণের নির্ণায়ক। যা সর্বযুগের, সর্বকালের সমাজ ও রাষ্ট্র বিজ্ঞানীদের কাছেও স্বীকৃত।
আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, “আল্লাহর কাছে একমাত্র মনোনীত দ্বীন-জীবনবিধান হচ্ছে ইসলাম।” (আল-কোরআন, আলে-ইমরান ১৯)
উল্লেখিত আয়াতের মাধ্যমেও আমরা নিশ্চিত হলাম আল্লাহর কাছে একমাত্র ধর্ম বা পথনির্দেশ এবং মানবজাতির জীবন পরিচালনা নীতি বা জীবনবিধান হিসেবে আল্লাহ ইসলামকে সাব্যস্ত করে দিয়েছেন। অন্যকোনো পথনির্দেশ বা জীবনবিধান, মতাদর্শ নয়। সুতরাং তাওহীদের প্রথম অংশ অথ্যাৎ আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা মেনে তাঁর ইবাদত করলেন। আর তাওহীদের দ্বিতীয় অংশ অথ্যাৎ আল্লাহর হুকুমাতের বিপরীতে মানবরচিত শয়তানি মতবাদ-আদর্শকে মানলেন। এর মানে, আপনি জেনে অথবা না জেনে শিরকে লিপ্ত হলেন।
মুসলমান মানে আপনাকে পরিপূর্ণভাবে হাক্কুল্লাহ (একমাত্র আল্লাহর উপাসনা করা), হাককুল হকুমাত (আল্লাহ প্রদত্ত শাসন ব্যবস্থা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, জননিরাপত্তা ও সামগ্রিক কল্যাণ সাধন}, হাক্কুল ইবাদ (মানুষের প্রতি মানুষের অধিকার এবং দায়িত্ব পালনে) ব্রত হওয়ার নাম।
আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদারগণ (বিশ্বাসী), তোমরা যথাযথভাবে আল্লাহকে ভয় করো (তাকওয়া অর্জন করা) এবং মুসলিম (আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী) না হয়ে যেন তোমাদের মৃত্যু না হয়।” (আল-কোরআনা, আলে-ইমরান- ১০২)
নামে মুসলমান হয়ে মানবরচিত তাগুত-শয়তানি মতবাদ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করলেন, লড়াই করলেন। এমনটি হলে আপনার সকল চেষ্টা-সাধনা হাক্কুল হুকুমাতের বিপরীত অর্থ্যাৎ আল্লাহ প্রদত্ত আইন-বিধানের বিপরীত হয়ে গেলো। মানে আপনি এক আল্লাহর অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জ করলেন। তার সঙ্গে দুনিয়াবি শক্তির শয়তানি মতবাদ-মতার্শকে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করলেন।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ আরও বলেন, “সেই ব্যক্তির কথার চেয়ে কার কথা উত্তম, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে, সৎকর্ম (নেক-আমল) করে, আর ঘোষণা করে যে আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত (আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারীদের একজন)।” (হা-মিম আস-সাজদাহ- ৩৩)
এখন আপনি বলুন, আপনি কার দিকে মানুষকে ডাকছেন। কাদের জন্য আপনার হৃদয়ে ভালোবাসা। কার বা কাদের জন্য আপনার চেষ্টা-সাধনাকে নিয়োজিত রাখলেন। তথাকথিত সেক্যুলারিজম, সোশ্যালিজম, কেপিটালিজম, ন্যাশনালিজম, লিবারিজম, মাকসিজমসহ ওমুক-তমুকের আদর্শকে সমর্থন বা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করছেন আপনি? এটি রীতিমত শিরক। আসলে আপনি তাওহীদকে ধারণ করছেন না। অথ্যাৎ আল্লাহর ইবাদত করে আবার তারঁ হুকুমাতের বিপরীত মানবরচিত হুকুমাত প্রতিষ্ঠায় আপনি নিজেকে নিয়োজিত রাখলেন। এর মানে আপনি আল্লাহর সঙ্গে দুনিয়াবি শক্তিকে শরীক করছেন, শিরকে লিপ্ত রয়েছেন। আপনার সকল আমল-সৎকর্মই ব্যর্থ।
আল্লাহ সুবহানু তাআলা এ বিষয়ে আল-কোরআনে ঘোষণা করেছেন- “বলো, আমি কি তোমাদের এমন খবর জানাবো, কর্মের দিক থেকে কারা পুরোপুরি ব্যর্থ, ক্ষতিগ্রস্ত?”
“এরা সেইসব লোক, যাদের পার্থিব জীবনের সকল কর্ম-প্রচেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে, বিফলে যাচ্ছে; অথচ তারা মনে করছে তারা সৎকর্ম করছে।” (কাহাফ- ১০৩-১০৪)
এ বিষয়ে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করলো এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য কাজ করলো সে-ই বুদ্ধিমান। আর যে ব্যক্তি নিজের নফসের গোলামী করলো (মন চাই জিন্দেগীতে আসক্ত হলো), অথচ আল্লাহর নিকটও প্রত্যাশা করলো, সে-ই ব্যর্থ। (তিরমিজি ২৪৫৯)
আসলে যিনি সত্যকে খোঁজেনি, বিবেককে জাগ্রত করেনি, অনাচার-অত্যাচার ও জুলুমকে ঘৃণা করেনি, তাওহীদের দাবিকে (একত্ববাদ- এক আল্লাহর ইবাদত ও আল্লাহর আইন-বিধানকে) ভ্রুক্ষেপ করেনি, তিনি কিভাবে নিজেকে মুসলমান দাবি করতে পারেন।
মহান মুনিবের দরবারে প্রার্থনা- সত্যিকার মুসলমান হয়ে, তওবা নসীব হয়ে, তাওহীদের কলেমা মুখে জারি রেখেই যেন আমাদের মৃত্যু হয়। আমিন।
জাকির মজুমদার
সাংবাদিক, সংগঠক