POPULAR BD NEWS
Popular BD News Logo

হাজীগঞ্জে ‘বীর নিবাস’ তালিকার ৩৭ জনের ৮ জনই সচ্ছল

পপুলার বিডিনিউজ রিপোর্ট | প্রকাশিত: অক্টোবর ১২, ২০২০ | সময়: ২:৪০ অপরাহ্ণ

মুক্তিযোদ্ধা মোখলেছুর রহমান। তাঁর গ্রামের বাড়ী হাজীগঞ্জ উপজেলা ২নং বাকিলা ইউনিয়নের রাধাসার গ্রাম। তিনি চট্টগ্রাম শহরে বসবাস করেন। সেখানে তার নিজস্ব মালিকানায় আছে বহুতল বাড়ি। তার এক ছেলে চট্টগ্রাম বন্দরে অফিসার পদে কর্মরত রয়েছেন। আরেক ছেলে বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত। তাদের সাথেই তিনি চট্টগ্রাম শহরে স্থায়ী ভাবে বসবাস করছেন। তার পরিবারের বাৎসরিক আয় কয়েক লক্ষ টাকা। অথচ হাজীগঞ্জ উপজেলা অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আবাসন প্রকল্পের সুপারিশকৃত কমিটির তালিকার ৪ নম্বরে ঠাঁই মিলেছে মোখলেছুর রহমানের।

৩ নং কালচোঁ ইউনিয়নের পিরোজপুর গ্রামের কেরামত আলী, পিতাঃ মৃত আলতাফ আলী। মুক্তিযোদ্ধা ও স্ত্রী তার সন্তানদের সাথে ঢাকায় বসবাস করেন। সন্তান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। বাবা মা বেঁচে থাকলেও মেয়ে সাফিয়া বেগমের আবেদনেই তাকে ঘর দেয়ার সুপারিশ করা হয়। জানা যায়, সাফিয়ার সাথে বরাদ্দ কমিটির এক সদস্যের সখ্যতা রয়েছে। তাকেই ঘরটি উপহার দেয়া হচ্ছে।অসহায় গৃহহীন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দকৃত ঘর বরাদ্দ দেয়ার সুপারিশ করা হয়। তালিকায় তার নাম ৮ নাম্বারে রয়েছে।


হাজীগঞ্জ উপজেলা নোটিশ বোর্ডে সাঁটানো তালিকার ৩৭ জনের মধ্যে মানবসমাজ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অন্তত আট জন সচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাকে অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই মুক্তিযোদ্ধা আবাসন প্রকল্প বরাদ্দ কমিটির সভাপতি হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বৈশাখী বড়ুয়া। রবিবার দুপুরে সরজমিনে গিয়ে জানা গেছে, তিনি ছুটিতে আছেন। তবে মুঠফোনে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, যদি কারো কোন অভিযোগ থাকে, তাহলে আপিল করার সুযোগ আছে।

যাছাই-বাচাই কমিটির সদস্য আবদুর রব খোকন মুঠফোনে বলেছেন, ২১৯ জন মুক্তিযোদ্ধা আবেদন করেছেন। তার মধ্য থেকে ৩৭জনকে ‘বীর নিবাস’ করে দেয়ার জন্য সুপারিশ কমিটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে জেলা প্রশাসকের কাছে আপিল করার সুযোগ আছে বলেও তিনি জানান।

অনুসন্ধানে সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, রাধাসা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মোখলেছুর রহমান ছাড়াও আরো সাতজনের সচ্ছলতার প্রমাণ মিলেছে। তারা হলেন, মোঃ আব্দুল মতিন পিতা মৃত মোঃ খাদেম আলী পন্ডিত, ৩ নং উত্তর ইউনিয়নের মাড়কি গ্রামে তার বাড়ি। তার ২ ছেলে প্রবাসে রয়েছে। স্ত্রী সংরক্ষিত আসনে ইউপি সদস্য। সচ্ছল ভাবে জীবন যাপন করছেন। তার সাথে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এক সদস্যের সাথে ঘর দেয়ার চুক্তি করা হয়েছে বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মুক্তিযোদ্ধা। তালিকায় ৭নাম্বারে রয়েছে।

উপজেলার ১০ নং গন্ধর্ব্যপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের পাঁচই গ্রামের এক মুক্তিযোদ্ধার বাড়ীতে নির্মাণাধীন ছাদ করা বিল্ডিং রয়েছে। দুই ছেলে ঢাকায় ব্যবসা ও চাকুরী করছেন। সেখানেই পরিবার বসবাস করছেন। তার পরিবার সচ্ছল জীবনযাপন করে আসছেন। তালিকায় তার নাম ২৮ নাম্বারে রয়েছে।

৫নং সদর ইউনিয়নের সুবিদপুর গ্রামের এক মুক্তিযোদ্ধা। কোটবাড়ি এলাকায় তিনি বাড়ি ও কিছু সম্পত্তি ক্রয় করে স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাস করে আসছেন। কিছুদিন পূর্বে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার ৪ ছেলের দুই ছেলেই চাকুরী করছে। বড় ছেলে সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার। তার পরিবারের বাৎসরিক আয় কয়েক লক্ষ টাকা। তালিকায় তার নাম ১২ নাম্বারে রয়েছে।

৭ নং ইউনিয়নের দেবীপুর গ্রামে মৃত আব্দুর রব। তার এক ছেলে প্রবাসে রয়েছে। পরিবার সচ্ছল ভাবে জীবন যাপন করছেন। তার বাড়িতে একটি বিল্ডিং ঘর রয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে অমুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মন্ত্রনালয়ে একটি অভিযোগ রয়েছে । তালিকায় তার নাম ১৯ নাম্বারে রয়েছে। একই ইউনিয়নের ঝাকনী গ্রামের শফিক ইসলাম। তিনি সবুজ বার্তায় অন্তর্ভুক্ত এবং বর্তমান ৭নং ইউনিয়ন ৫নং ওয়ার্ডের মেম্বার হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। তালিকায় তার নাম ২১ নাম্বারে রয়েছে।

দ্বাদশ ইউনিয়নের কীর্ত্তনখোলা গ্রামের মোখলেছুর রহমান। তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে সম্প্রতি অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে তার সন্তানও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। তালিকায় তার নাম ৩৪ নাম্বারে রয়েছে।

একধিক মুক্তিযোদ্ধার সাথে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে স্বজনপ্রীতি ও মুক্তিযোদ্ধাদের একজন প্রতিনিধি আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করে সচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় স্থান করে দেয়। ঘর পেতে প্রকৃত অসচ্ছলদের মধ্যে অনেকেই বাদ দেয়া হয়েছে ।
জানা গেছে, আবাসন প্রকল্পের যাছাই-বাছাই কমিটিতে রয়েছেন ৫জন। তাঁরা হলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রকৌশলী কর্মকর্তা, সমাজসেবা কর্মকর্তা ও মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের এবং মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রব খোকন।

কমিটির সদস্যবৃন্দ যা বললেন-
জানতে চাইলে হাজীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মঞ্জুরুল আলম বলেন, আমি এই বিষয়ে কিছু বলতে পারবো না। সমাজসেবা কর্মকর্তা আবু ইসহাক। তিনি রবিবার অফিসে আসেননি। মুঠফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের মুঠফোনে বলেন, ৩৭ জনের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে আট/দশজনের বিল্ডিং বা স্বচ্ছল এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব নির্বাহী কর্মকর্তা জানেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের আবাসন প্রকল্পের নাম ‘বীর নিবাস’। যা থাকছে এই বীর নিবাসে….
প্রকল্পের আওতায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য যে বাড়ি নির্মাণ করা হবে, তার নাম ঠিক করা হয়েছে ‘বীর নিবাস’। এসব বাড়ি হবে একতলাবিশিষ্ট। থাকবে তিন বেডরুম ও একটি ড্রইং-ডাইনিং। চার ডেসিমেল জমিতে ৯০০ বর্গফুট আয়তনের একেকটি ভবনের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এ লক্ষ্যে আগ্রহী অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধার আবেদন সংগ্রহ বা তার সম্মতির ভিত্তিতে জেলা ও উপজেলাওয়ারি তালিকা পাঠাতে দেশের সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে এই তালিকা পাঠাতে হবে।

যাছাই-বাছাই প্রসঙ্গে সরকারী নির্দেশনা –
সরকারের নির্দেশিকা অনুযায়ী অসচ্ছল বলতে যাদের বার্ষিক আয় (মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা ব্যতীত) ৬০ হাজার টাকার নিচে এবং নিজস্ব কোনো বাড়িঘর নেই বা কুঁড়েঘরে থাকেন, এমন মুক্তিযোদ্ধাকে নির্দেশ করবে। কিন্তু এই নির্দেশনা অগ্রাহ্য করে হাজীগঞ্জ উপজেলার অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের আবাসিক প্রকল্পের তালিকা সুপারিশ করা হয়। এছাড়া আবাসন বরাদ্দের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও অযোগ্যতা এবং বরাদ্দ প্রক্রিয়ার বিষয়ে নীতিমালায় বলা হয়েছে, আবেদনকারীকে গেজেটভুক্ত হতে হবে। যেসব অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ/প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার বিধবা স্ত্রী ও সন্তান, ইতিপূর্বে মন্ত্রণালয় বা কোনো সরকারি দপ্তর/সংস্থা থেকে প্লট/ফ্ল্যাট/আবাসন বরাদ্দ পাননি বা আবাসনের জন্য কোনো ঋণ পাননি, তারাই আলোচ্য প্রকল্পের আওতায় আবাসন বরাদ্দ পাওয়ার জন্য যোগ্য হবেন এবং আবেদন করতে পারবেন। স্ত্রী ও সন্তানের একাধিক ওয়ারিশের ক্ষেত্রে কো-শেয়ারারদের ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অনাপত্তিপত্র দিতে হবে। যেসব অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা ও সন্তানের মালিকানায় কোনো ভিটা জমি নেই, তাদের অনুকূলে আবাসন নির্মাণের উপযোগী খাসজমি দখলে থাকলে কিংবা খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়া সম্ভব হলে জমি বন্দোবস্ত করা হবে। এর মধ্যে বীরাঙ্গনাদের ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরাসরি বরাদ্দ দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যাচাই ছাড়াই আবেদনটি সরাসরি মন্ত্রণালয়ে পাঠাবেন। মন্ত্রণালয় যাচাইয়ের পর তাদের আবাসন বরাদ্দ দেবে। পাশাপাশি একইভাবে অসচ্ছল ভূমিহীন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, বিধবা (শেরপুরের বিধবা পল্লি কিংবা অনুরূপ স্বীকৃত কোনো বিধবা পল্লির) ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী/সন্তান, প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার বিধবা স্ত্রীকে (অসচ্ছল/ভূমিহীন হলে) অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
বর্তমানে দেশে কতজন অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন, তার কোনো তালিকা মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই। তবে ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই উপজেলা পর্যায়ে অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন চূড়ান্ত করা হবে।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, দেশে দুই লাখ ১১ হাজার গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা আছেন।

অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের আবাসনের জন্য দেশের জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ১৪ হাজার একতলা বাড়ি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে চলমান ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপনের আওতায় এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

পপুলার বিডিনিউজ | বস্তুনিষ্ঠতা প্রকাশে দুরন্ত
কার্যালয়: কেনাকাটা মার্কেট, ৪র্থ তলা, হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর।
নিউজ ও বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৬-৪৬৯৫০৫ | ইমেইল: newspopular2020@gmail.com

© 2026 পপুলার বিডিনিউজ — অনুমতি ছাড়া লেখা/ছবি/ভিডিও ব্যবহার বেআইনি
প্রিন্ট করুন