এসময় চলতি ও আগামী বছরের এসএসসি-এইচএসসি এবং এবারের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষাসহ দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ক্লাস কার্যক্রম নিয়ে পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। করোনাকালে গত এক বছর শিক্ষা এগিয়ে নিতে বাস্তবায়িত ও গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ, কারিকুলাম আধুনিকায়ন, বেসরকারি কলেজে অনার্স-মাস্টার্স প্রোগ্রামের ভবিষ্যৎসহ আরও বেশকিছু বিষয়ে তথ্য তুলে ধরেন।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, এসব নিয়ে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয় শিক্ষামন্ত্রীর। সেই আলোকে তিনি ছুটি বৃদ্ধি এবং শ্রেণি কার্যক্রম চালুর ব্যাপারে তথ্য উল্লেখ করেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমাদের মেসেজটা হচ্ছে- ১৩ জুন থেকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চল্লিশোর্ধ্ব সবাই টিকা পেয়েছেন। এখন ১৮ বছর পর্যন্ত বয়সি যাদের জাতীয় পরিচয়পত্র আছে তাদের টিকা দেওয়া হবে। টিকা নিয়ে সমস্যা ছিল। এখন টিকা আসছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেওয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন করেছেন।’
এক প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমাদের যে পরিস্থিতি আছে মহামারির, তার সঙ্গে সম্প্রতি ঈদ যাত্রার কারণে কিছুটা সংক্রমণের হার বেড়েছে। কোনো কোনো জেলায় সংক্রমণের হার বেশ বেড়েছে। সে কারণে সব বিষয় বিবেচনা করেই ১২ জুন পর্যন্ত ছুটি বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, ছুটি বাড়ানো নয়, মূল বিষয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া। পরিস্থিতি যদি অনুকূলে না থাকে, তাহলে হয়তো ভিন্ন সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তবে এলাকাভেদে আলাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পরিকল্পনা নেই। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কোথাও খুলব, কোথাও খুলব না, সেক্ষেত্রে অসাম্য আরও বেশি তৈরি হবে।
আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা খতিয়ে দেখতে সরকার তথ্য সংগ্রহ করছে। যেহেতু এখন নানাভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছি তাই সেই ক্ষতিটা কম হবে। অন্যদিকে এ সময়ে আমরা বিভিন্ন ধরণের প্রযুক্তি ব্যবহার করে পড়ালেখায় অভ্যস্ত হয়েছি। তাই আমরা ক্ষতি সহজেই পূরণ করতে পারব। তিনি বলেন, আমাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে। সেটা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা করছি। ক্ষতিটা নিরূপণ যত তাড়াতাড়ি হবে, ক্ষতি কীভাবে কত সময়ে পূরণ করতে পারব, সেটা বুঝতে পারব। আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি। তার আলোকে পরিকল্পনা করা সহজ হবে। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন, শিক্ষা উপমন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরী, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মাহবুব হোসেন, কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের সচিব আমিনুল ইসলাম খান প্রমুখ।
বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে দেরি হবে : শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আবাসিক হলগুলোতে অনেক শিক্ষার্থী বসবাস করে, যেখানে স্বাস্থ্য বিধি প্রতিপালনে চ্যালেঞ্জ আছে। টিকা দেওয়ার ব্যাপারে আমরা তথ্যগুলো চেয়েছি ইউজিসির মাধ্যমে। কতজন টিকা পেয়েছেন সেটার পাশাপাশি কতজন টিকা দেওয়ার উপযোগী আছেন সেই তথ্য পাওয়া গেছে ।
তিনি বলেন, আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই ৪০ বছরের নিচে। আমরা ধরেই নিয়েছি তাদের অধিকাংশেরই টিকা দিতে হবে এবং কাজটি দ্রুত শুরু করতে পারব আমরা। তাদের দুই ডোজ টিকাই দিতে হবে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমাদের আরেকটু চিন্তা করতে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খোলার সিদ্ধান্ত টিকার ওপর খানিকটা নির্ভর করছে।
দুই বছরের এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষা : এবারের এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষা ফেব্রুয়ারি-এপ্রিলে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা বাতিল হয়েছে। শুধু তাই নয়, শিক্ষার্থীরা গত দেড় বছর সরাসরি ক্লাস পায়নি। এসব বিবেচনা করে তাদের পরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ১৩ জুন স্কুল, কলেজ খুলে দেওয়া হলে সেদিন থেকে পরবর্তী ৬০ কর্মদিবসে চলতি বছরের এসএসসি-দাখিল পরীক্ষার্থীদের এবং ৮৪ কর্মদিবসে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের ক্লাস হবে। পরে প্রতি স্তরের জন্য ১৫ দিন বিরতি দিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হবে। তাদের জন্য শিখনফল বিবেচনায় নিয়ে কাস্টোমাইজড (সংক্ষিপ্ত) সিলেবাস করা হয়েছে। তার আলোকে পরীক্ষা হবে। তিনি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেন শিক্ষার্থীদের। সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ না জানানোর কারণে পরীক্ষা অনিশ্চিত কিনা- এমন প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আমি অনিশ্চিত বলব না। যখনই পরিস্থিতি আয়ত্তে আসবে তখনই পরীক্ষা হবে। কোনোভাবেই গত বছরের মতো অটো পাশ দেওয়া হবে না।’
আগামী বছরের এসএসসি-এইচএসসি : মন্ত্রী বলেন, আগামী বছরের এ দুটি পরীক্ষার শিক্ষার্থীরাও একইভাবে সরাসরি পদ্ধতির পাঠদানে অংশ নিতে পারেনি। তাদের পরীক্ষাও হবে কাস্টোমাইজড সিলেবাসে। তাই এসএসসির জন্য ১৫০ দিন এবং এইচএসসির জন্য ১৮০ দিন ক্লাস করানোর জন্য সিলেবাস তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া জুন থেকে সপ্তাহে দুটি করে অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হবে।
জেএসসি নাও হতে পারে : এ বছর জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পরীক্ষা নেওয়ার পরিস্থিতি হলে নেওয়া হবে। আর না হয় অ্যাসাইনমেন্টের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শ্রেণি কার্যক্রমের পরিকল্পনায় যা আছে : মন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, ১৩ জুন খুলে দেওয়া সম্ভব হলে প্রথমে শুধু ৬ দিনই স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় যাবে এ বছর ও আগামী বছরের এসএসসি, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা। এছাড়া পিইসি পরীক্ষার্থীরাও ৬ দিনই স্কুলে যাবে বলে জানান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন। শিক্ষামন্ত্রী এ প্রসঙ্গে বলেন, ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে একদিন করে ক্লাসে যাবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী পরে সংখ্যা বাড়বে। একই পন্থা প্রাথমিক স্তরের চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে বলে জানান গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী।
বেসরকারি কলেজে বন্ধ হবে অনার্স-মাস্টার্স : শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বেসরকারি কলেজ পর্যায়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, পর্যায়ক্রমে এই অনার্স-মাস্টার্স বন্ধ করে দিয়ে সেখানে ডিগ্রি স্তরে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করবেন, নানা ধরনের শর্ট কোর্স, ডিপ্লোমা কোর্সগুলো করানো হবে। যেগুলো অনেক বেশি কর্মমুখী, আত্মকর্মসংস্থানে, উদ্যোক্তা তৈরিতে যেগুলো উপযুক্ত হবে। জনসংখ্যাকে দক্ষ জনসম্পদে রূপান্তরিত করতেই এ পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, সব কলেজে অনার্স-মাস্টার্সের তেমন কোনো প্রয়োজন হয়তো নেই। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষিত বেকার তৈরি হচ্ছে। আমরা সেটা চাই না। আমরা জনসংখ্যাকে দক্ষ জনসম্পদে রূপ দিতে চাই। এ লক্ষ্যে উপযুক্ত শিক্ষা সম্প্রসারণের একটি প্রয়াস এটি। তবে এখনই কলেজগুলোতে অনার্স-মাস্টার্স বন্ধ হচ্ছে না বলে জানান তিনি। এ কাজটি একদিনে হঠাৎ করে বন্ধ করে দিয়ে করা যাবে না। সেজন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমরা কাজ শুরু করেছি। ইতোমধ্যে কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। তারা পুরো বিষয়টি দেখছেন। নানা ধরনের পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে এ সিদ্ধান্তগুলো নিতে হবে।