POPULAR BD NEWS
Popular BD News Logo

সাধারণ হয়েও অসাধারণ একজন কাদের ভাই

মোজাম্মেল হক চৌধুরী মোহন | প্রকাশিত: জুন ৫, ২০২০ | সময়: ৩:১১ অপরাহ্ণ

গ্রিন লাইব্রেরির কাদের ভাই ইন্তেকাল করেছেন। কাদের ভাইয়ের মৃত্যুর পরে ভেবেছিলাম তাকে নিয়ে দু-কলম লিখব। কিন্তু প্রতিদিনই কাদের ভাইয়ের সাথে মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছেন আরো অনেক আপনজন। তারপরেও কাদের ভাইকে নিয়ে আজ কিছু লিখছি।

আমি ঊনআশি সনে হাজীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। যেহেতু, স্কুল জীবনের পরে উচ্চ মাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পড়াশুনা চট্টগ্রামে করি সেহেতু হাজীগঞ্জ সদর সম্পর্কে আমার বেশি কিছু জানা ছিল না। আপনজনদের মাঝে ডাক্তার নজরুল ইসলাম ছাড়া আমার এলাকার অন্য কাউকে চিনতাম না। উনাকে আমি মামা বলে সম্বোধন করতাম।

কলেজে ১লা অক্টোবর প্রথম যোগদান করি সেদিনই অধ্যাপক রতন ভাই, শহিদুল্লাহ ভাই, অংকের কালাম সাহেব, বাংলার জহির স্যার ও ইংরেজির রণজিৎ বণিক সহ বিকেল বেলা কলেজ থেকে এসে গ্রিন লাইব্রেরি তে বসি। কাদের ভাইয়ের সাথে সেদিনই প্রথম পরিচিত হই। তিনি আমাদের কে চা পানে আপ্যায়িত করেন। যে পাঁচজন শিক্ষকের কথা উল্লেখ করলাম তারা আমার সিনিয়ার ছিলেন এবং তারা আগে থেকেই গ্রিন লাইব্রেরি তে বসতেন। পরবর্তী কালে জব্বর সাহেব, অধ্যাপক রশিদ সাহেব, শরীফ সাহেব, নুরুল ইসলাম বিএসসি, স্বপন পাল, অনিতা পাল ও ইংরেজীর সেলিম সাহেব কলেজে যোগদান করলে তারাও গ্রিন লাইব্রেরিতে আসা যাওয়ার পথে বসতে শুরু করেন। এমনি করে গ্রিন লাইব্রেরি পরিনত হয় হাজীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষকদের মিলনকেন্দ্র এবং ক্রমে ক্রমে কাদের ভাই হয়ে যান আমাদের আত্মার পরম আত্মীয়।

উল্লেখ্য আমার যোগদানের দশ বছর পূর্বে হাজিগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ওই সময়ে ডিগ্রি কলেজ ছাড়া উপজেলায় আর একটি মাত্র কলেজ ছিল সেটি নাসিরকোট কলেজ। নাসিরকোট কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ কামাল উদ্দিন সাহেব এবং অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান নানা সহ আরো দু-একজন শিক্ষকের ঠিকানাও ছিল এই গ্রিন লাইব্রেরি।

বলতে দ্বিধা নেই, হাজিগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষকদের চিঠি-পত্র এমন কি কলেজের চিঠি-পত্র ও ডাকপিয়ন কলেজে না পৌছে দিয়ে গ্রিন লাইব্রেরি তে দিয়ে যেত।কারণ, হাজিগঞ্জের পোস্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দেখতেন গ্রিন লাইব্রেরি তে শুধু ডিগ্রি কলেজের শিক্ষকরা ই বসেন না এখানে প্রায়ই বসেন কলেজের অধ্যক্ষ প্রয়াত বাবু সুকলাল সাহা। এখানে অধ্যক্ষের অবস্থানের কারণে কলেজের প্রধান সহকারী বাবু সুভাষ চন্দ্র সাহার ও আসতে হত। এভাবেই গ্রিন লাইব্রেরি পরিনত হয় হাজিগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের আরেক ঠিকানা।

ঐসময়ে মাঝে মাঝে এই লাইব্রেরি তে বসতেন হাজিগঞ্জের সর্বজন শ্রদ্ধেয় অবঃ প্রধান শিক্ষক জনাব আব্দুল মান্নান মিয়া। লাইব্রেরিতে উনার বসা অবস্থাতেও আমরা যেতাম। উনি আমাদের সাথে কলেজের অবস্থা এবং কুশলাদি বিনিময় করতেন। কিন্তু আমরা উনার সামনে চেয়ারে বসতে চাইতাম না। সেই সময়ের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ হাজীগঞ্জ পাইলট হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক কাজী বজলুল হক স্যার তিনিও মাঝেমাঝে এই গ্রিন লাইব্রেরি তে বসতেন এবং আমাদের সাথে শিক্ষা ব্যবস্থার নানাবিধ বিষয়ে পরামর্শ করতেন। এই দুইজন স্বনামধন্য প্রধান শিক্ষক হাজীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের গভার্নিং বডির সম্মানিত সদস্য ছিলেন। উনারা কেউ আজ বেঁচে নেই। উনাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

শিক্ষকদের এই মিলনকেন্দ্রে ক্রমান্বয়ে বসতে শুরু করেন প্রধান শিক্ষক কাজী শাহজাহান আলী (বলাখাল), পালিসারার মহিউদ্দিন স্যার, সৈয়দ আহমেদ, নীপেন্দ্র সাহা সহ আরো অনেকে। শিক্ষক সমাজের পাশাপাশি এই গ্রিন লাইব্রেরি তে অন্য উল্লেখযোগ্য যারা আসতেন তাদের মধ্যে ছিলেন বিএম কলিমুল্লাহ, আলী আহমেদ চেয়ারম্যান, আলী আজজম মজুমদার (আজু ভাই), জামাল উদ্দিন ভুইয়া, আবুল ফারা চেয়ারম্যান, শরিফুল্লাহ পাটোয়ারী, সদরের মনির হোসেন চেয়ারম্যান, বীর মুক্তিযোদ্ধা হোসেন ইমাম হায়দার, এডভোকেট এম আর হায়দার, বীর মুক্তিযোদ্ধা নয়ন ভাই সহ হাজীগঞ্জ থানার বিভিন্ন স্কুল-মাদ্রাসার অগনিত শিক্ষকবৃন্দ সহ অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা। কলিমুল্লাহ ভুইয়া সাহেব যখন আসতেন তখন প্রায়শই কিছু রাজনৈতিক চর্চা হত। এই রাজনীতি চর্চার ফাঁকে ফাঁকে কিছু গরম কথাবার্তা ও চলত।

সাধারণ হয়েও অসাধারণ একজন কাদের ভাই

প্রিয় কাদের ভাই দাড়িয়ে দাড়িয়ে সবই প্রত্যক্ষ করতেন এবং মিটিমিটি হাসতেন। কিন্তু কোন আলোচনায় অংশগ্রহণ করতেন না। কখনো কখনো এই আলোচনার সময় বলতেন, “গরমের মাঝে গরম চা হলে কেমন হয়?” গ্রিন লাইব্রেরিতে বসত কিন্তু কাদের ভাইয়ের চা খায় নি এমন মানুষ খুবই কম। আমাদের এই বসায় এই আলোচনায় হয়ত বা উনার ব্যাবসায়িক কিছু ক্ষতিও হতো কিন্তু কোনদিনই তার চেহারায় এরকম কোন বিরক্তির ছাপ দেখতে পাই নি। গুনীজন-সুধীজনদের অবস্থানের কারণে অনেকসময় গ্রিন লাইব্রেরিতে ক্রেতা ছাত্র-ছাত্রীদের অনেকেই ঢুকতে চাইত না। এতে তার ব্যাবসায়িক কিছুটা হলেও ক্ষতি হত। কিন্তু সেদিকে তার কোন ভ্রুক্ষেপ ছিল না। সেজন্য আমরাও আরো দীর্ঘ সময় ধরে জেঁকে বসে থাকতাম। এ এক মহান চরিত্রের অধিকারী কাদের ভাই। অর্থনৈতিক ক্ষতিকে সহজ ভাবে নিয়ে গুনীজন শিক্ষিত সমাজের কদর করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তিনি একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন। ছিলেন স্বল্পভাষী কিন্তু স্পষ্টবাদী এবং নির্মল চরিত্রের একজন মানুষ। ২৫ বৎসরের মাঝে হাসিখুশি এই মানুষটির মুখে কখনো কোন কটুকথা শুনি নি। তিনি অনেক উচ্চ শিক্ষিত ছিলেন না কিন্তু জ্ঞানী ছিলেন।তিনি অনেক ধনী ছিলেন না কিন্তু অনেক ভালো মনের একজন মানুষ ছিলেন।

আজ গ্রিন লাইব্রেরি ও নেই কাদের ভাই ও নেই। এখানে যারা আসতেন এবং বসতেন সেসকল গুনীজন-সুধীজনদেরও অনেকেই আজ নেই। এভাবে একদিন কেউই থাকবে না কিন্তু থেকে যাবে তাদের স্মৃতি। কাদের ভাই সহ এই লেখার সাথে সংশ্লিষ্টদের মাঝে যারা প্রয়াত সবার রুহের মাগফেরাত এবং জীবিত দের নেক হায়াত কামনা করি।

পপুলার বিডিনিউজ | বস্তুনিষ্ঠতা প্রকাশে দুরন্ত
কার্যালয়: কেনাকাটা মার্কেট, ৪র্থ তলা, হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর।
নিউজ ও বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৬-৪৬৯৫০৫ | ইমেইল: newspopular2020@gmail.com

© 2026 পপুলার বিডিনিউজ — অনুমতি ছাড়া লেখা/ছবি/ভিডিও ব্যবহার বেআইনি
প্রিন্ট করুন