সম্প্রতি দেখা গেছে করোনা উপসর্গে মৃত্যু এমন বেশিরভাগ মৃত ব্যক্তির নমুনা টেস্ট আসছে নেগেটিভ। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও প্রিন্ট মিডিয়ায় করোনা রিপোর্ট প্রকাশে আরও যত্নশীল হওয়ার প্রয়োজন রয়েছেl করোনার ব্যাপারে কিছু ভুল তথ্য যে কোন মাধ্যমে প্রকাশের কারণে কিছু পরিবার ভোগান্তির শিকার হতে পারে, এটা অবশ্যই সবার মাথায় রাখা উচিত।
যেমন করোনা টেস্টের পূর্বেই ঘোষণা দেয়া হয় করোনা উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে। এই কথাটা কি এভাবে বলা বা প্রকাশ করা ঠিক? সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাজিগঞ্জে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এমন খবর চাউর হয়। মিডিয়াও খবর গুলো এভাবে প্রকাশিত হয়। পক্ষান্তরে এদের নমুনা সংগ্রহ করে টেস্টে পাঠালে, ৫ জনের একজনেরও করোনা পজেটিভ আসেনি। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী চাঁদপুর জেলায় করোনা উপসর্গে মারা গেছে বলে প্রকাশিত ৩৪ জনের নমুনা সংগ্রহ করে টেস্টে দেওয়ার পর ১৯ জনের করোনা নেগেটিভ আসে।
আরেকটি বিষয় মানুষের ভুল ধারণা রয়েছে! অনেকে মনে করেন, করোনা রোগীর খারাপ অবস্থায় শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। এর পাশাপাশি এটাও মানুষের জেনে রাখা উচিত যক্ষা, নিউমোনিয়া, হৃদ রোগ সহ বেশ কিছু রোগেও রোগীর অবস্থা খারাপের দিকে গেলে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। সুতরাং শ্বাসকষ্ট হলেই যে করোনা রোগী এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে আমাদের বের হয়ে আসা উচিত। সুতরাং করোনা টেস্টের পূর্বে এভাবে বিষয়টাকে উপস্থাপন করা একধরনের প্রোপাকান্ডা ও গুজবেরই শামিল।

করোনা টেস্টের পূর্বেই কোন মৃত ব্যক্তিকে যদি বলা হয় করোনা উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে, তাহলে এটা মৃত ব্যক্তির প্রতি অন্যায় করা হলো। এতে কোন সন্দেহ নেই। এ ধরনের বক্তব্যের কারণে মৃত ব্যক্তিকে আত্মীয়-স্বজনের শেষ দেখা দেখি ও সঠিকভাবে সৎকারের কাজ থেকে মৃত ব্যক্তি বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে মৃত ব্যক্তির পরিবারও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এ চিত্র প্রায় সারা বাংলাদেশেরই। টেস্ট এর পূর্বে কোন মৃত ব্যক্তির ব্যাপারে এ ধরনের বক্তব্য যে বা যাহারা দেন তাদের এমন বক্তব্য থেকে বিরত থাকা উচিত।
বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সবাইকে তো অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অপরিহার্য্য। এ করোনা প্রতিরোধে সারা বিশ্বে হোম কোয়ারেন্টাইন একটা স্বীকৃত ব্যাপার। সহজ ভাষায় বললে, নিরাপদ ও সুরক্ষিত থাকার জন্য নিজ ঘরে বা বাসস্থানে অবস্থান করা। অন্যদিকে অতি জরুরী কাজে বের হলে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক স্বীকৃত ব্যাপার। এই বিষয়গুলো সঠিকভাবে মানতে পারলে করোনা ভাইরাসের চেইনটা ভেঙ্গে যায়, আর একজন থেকে আরেকজন আক্রান্ত না হতে পারলে এর সংক্রমণ হার কমতে থাকে। তারপরও অসাবধানতা বসত কারো কারো করোনা আক্রান্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশে মানুষের মধ্যে একটি প্রবণতা রয়েছে, সেটা হচ্ছে করোনা হলে গোপন রাখার চেষ্টা করা। এতে করে তার সংস্পর্শে অন্য কেউ আসলে সে ব্যক্তিও আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। করোনা আক্রান্ত হলে গোপন রাখার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে কিছু সামাজিক সমস্যা ও ভীতির কারণও রয়েছে। প্রথমত করোনা রোগীর ব্যাপারে হাসপাতাল সম্পর্কে কিছু ভীতিকর ধারনা বা গুজব রটানো হয়েছে, অন্যদিকে সামাজিকভাবে আক্রান্ত ব্যক্তিকে মনোবল না দিয়ে বরং যতো কোন ঠাসা করে রাখা যায় সে চেষ্টা করা হতো। যদিও ইতিমধ্যে এই ধ্যান ধারনার কিছু পরিবর্তন এসেছে। করোনা রোগীকেও মানুষ এখন বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন। মনোবল তৈরীর চেষ্টা করেন।

অতি সম্প্রতি হাজিগঞ্জ পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ড এর ট্রাক রোডের একটি আবাসিক বাসায় জনৈক মহিলার করোনা রিপোর্ট পজিটিভ আসে। এরপর থেকে প্রশাসন নিয়ম মাফিক ঐ বাসাটি লকডাউন করে। কিন্তু তাদের মনোবল ঠিক রাখার জন্য যা যা প্রয়োজন সেটিও প্রশাসন অব্যাহত রেখেছেন। এদিকে তাদেরকে চিনে জানে এমন অনেককে দেখেছি তাকে ফোন দিয়ে উৎসাহ দিতে। অবশ্যই এটি একটি ভালো দিক।
সর্বশেষ গত ১৫ মে হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য খাদ্য সামগ্রী উপহার হিসেবে পাঠান। খাদ্যসামগ্রীর সাথে একটি মেসেজ লেখা ছিল, সেটি হচ্ছে -‘”আমরা করব জয়’ নিজের যত্ন নিন।মনোবল হারাবেন না। আমরা সবাই আপনার পাশে আছি।- বৈশাখী বড়ুয়া উপজেলা নির্বাহি অফিসার, হাজিগঞ্জ চাঁদপুর।” করোনা রোগীর মনোবল বাড়াতে এমন মানবিক মেসেজ একটা অনন্য দৃষ্টান্ত। করোনা ভাইরাস সম্মিলিত ভাবে প্রতিরোধ করতে এ মেসেজটি সবার অনুসরণ করে করোনা রোগী ও করোনায় মৃতদের প্রতি সবার আরও উদার হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তাছাড়া করোনা দুঃসংবাদের পাশাপাশি যারা বিভিন্নভাবে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ্য হচ্ছেন, সেগুলিও প্রচার করার প্রয়োজন রয়েছে এবং কি ধরণের চিকিৎসায় রোগী সুস্থ্য হয়েছে তাও প্রচার করার প্রয়োজন রয়েছে ।
এতে মানুষের মনোবল কিছুটা হলেও দৃঢ় হবে। কারণ করোনা প্রতিরোধে মনোবলও এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই করোনা সংবাদ প্রচার ও প্রতিরোধে আমরা আরও সচেতন হবো। এটাই প্রত্যাশা রইল।
লেখক -সাংবাদিক, শিক্ষক ও চারুশিল্পী