কৈশোরে ঈদের ছুটিতে একবার গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম। একদিন বিকেলে মা-চাচিদের সঙ্গে হাঁটতে বের হয়েছি। হঠাৎ সামনে একটি জটলা চোখে পড়ে। উচ্চকণ্ঠে ঝগড়া করছেন দুই নারী। জানতে পারলাম সম্পর্কে তাঁরা সতিন। ‘সতিন’ শব্দটির সঙ্গে সেই প্রথম পরিচয়। ঝগড়ার বিষয়, সংসারে দুই নারীর কাজের বণ্টন। ঝগড়ার তীব্রতা বাড়তেই থাকল। প্রবীণ এক নারী কী বুঝে মন্তব্য করলেন, ‘এ জন্যই বলি মেয়েমানুষ মেয়েমানুষের শত্রু।’ তাঁকে সমর্থন করলেন উপস্থিত কয়েকজন নারী ও পুরুষ। ধন্দে পড়ে গেলাম। চিন্তা করে কূলকিনারা পেলাম না। নারী দুজন একে অন্যের শত্রুর খেতাব পেলেও যাবতীয় সমস্যার মূলে থাকা পুরুষটির দিকে আশ্চর্যজনকভাবে কেউ আঙুল তুলল না।
আমাদের সমাজে ‘নারীই নারীর শত্রু’ কথাটি যেন এক স্বীকৃত সত্য হয়ে গেছে। অবাক হই, দুনিয়ায় রোজ লাখ লাখ পুরুষ অন্য পুরুষের সম্পত্তি আত্মসাৎ করছে, হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ করছে; অথচ ‘পুরুষই পুরুষের শত্রু’ এমন কথার চল হয়নি কিন্তু। অথচ নারীরা বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ‘নারীর শত্রু’ উপাধি নিয়ে জীবন অতিবাহিত করছে।
নারীর প্রতি সংঘটিত এসব অপরাধ পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটিতে গুরুত্বের সঙ্গে বলা হয় ‘নিজেদের ঘরই নারীর জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থান।’ বাংলাদেশের চিত্র আরও ভয়াবহ। এ দেশের ৭০ শতাংশ নারী স্বামী কিংবা ঘনিষ্ঠ সঙ্গী দ্বারা পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হন। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুসারে বিশ্বের যেসব দেশে স্বামী বা সঙ্গীর হাতে নারী নির্যাতনের হার বেশি, সেই তালিকায় বাংলাদেশের স্থান এখন চতুর্থ। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ; যেখানে প্রায় ৫২ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। প্রতিদিন হাজার হাজার নারী ধর্ষণসহ নানা ধরনের যৌন নির্যাতনের শিকার হন। পুরুষের সহিংস আচরণের ফলে নিজের ঘর নারীর জন্য সবচেয়ে অনিরাপদ স্থানে পরিণত হলেও নারী অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে ‘নারীর শত্রু’ খেতাবটির অধিকারী হন।