চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার হাটিলা পূর্ব ইউনিয়নের শিক্ষার্থী ইশরাত জাহান রুপার স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে ফ্রান্সে থাকা বাবার কাছে পাড়ি জমানো। কিন্তু গত ১৬ সেপ্টেম্বরের একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা তার সব স্বপ্ন নিমিষেই ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। বই-খাতা আর পড়াশোনায় মুখর থাকা ইশরাত এখন বিছানায় শুয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম যন্ত্রণা ভোগ করছেন। ইশরাত হাজীগঞ্জ সরকারি মডেল কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
চাঁদপুর-কুমিল্লা মহাসড়কের উয়ারুক স্টেশন এলাকায় সিএনজি চালিত অটোরিকশাকে পেছন থেকে একটি ট্রাক ধাক্কা দেয়। ধাক্কার পরপরই কলেজ শিক্ষার্থী ইশরাত জাহান রুপার মুখে ও শরীরে প্রচন্ড আঘাত লেগে ছিটকে পড়ে। এরপর ট্রাকটি তাকে পুনরায় চাপা দেয়, এতে তার দুই পা, হাত ও প্রায় ১৩টি দাঁত ভেঙে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক জখম হয়। চালকের অসাবধানতা ও ড্রাইভিং করার সময় মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণেই এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেন এই শিক্ষার্থী।
সরজমিনে গেলে ইসরাত জাহান বলেন, ‘চলন্ত অবস্থায় পিকআপ আইসা ধাক্কা মারছে প্রথমে। ধাক্কার ফলে প্রথমে আমার মুখে ব্যথা পাইছি, এই দিক দিয়ে এই দিক দিয়ে ব্যথা পাইছি। তারপরে আমি ছিটকে পড়ে গেছি। পড়ে যাওয়ার পরে পিকআপটা আবার মারছে। আবার মারার পরে ওই সিএনজিটা আমার ঘাড়ের উপরে এসে পড়ছে। পড়ার পরে আমার হাত ভাঙছে, দুইটা পা ভাঙছে। দাঁত পড়ে গেছে। উনি দাঁত পড়সে, দাঁত পড়ছে, মারে ভাঙছে। মারে সবাই কি ব্যথা পাইছে অনেক।
আহত এই শিক্ষার্থী আরো বলেন, ড্রাইভারটা ফোন চালাইতে চালাইতে গাড়ি গাড়ি চালাইতাছিল, ফোন দেখতে দেখতে। ওর কিছু কয় না, আমি ওর বিচার চাই। ওর আজকে ও ফোন চালাইতে চালাইতে গাড়িটা চালানোর ফলে আমার এত বড় ক্ষতি হইছে। যার কারণে আমি আজকে শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করতেছি। তারপরে আমার পড়াশোনার ক্ষতি হইছে। আমি এখন আমার কোনো কিছুই করতে পারতেছি না। ভবিষ্যতে কি আমি হাঁটতে পারব কিনা সেটারও কোনো ইয়া নাই। আমি হাঁটতে চাই আগের মতো। আমি আগের মতো আবার হাঁটতে চাই, আগের মতো ক্লাস করতে চাই। আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।
স্বপ্নের কথা তুলে ধরে ইশরাত বলেন, ‘আমার স্বপ্ন ছিল, আমি পড়াশোনা শেষ করে আমার আব্বুর কাছে বিদেশে যাব। কিন্তু এই সড়ক দুর্ঘটনায় আমি আমার স্বপ্ন কমপ্লিট করতে পারব কিনা সেটার কোনো শিউরিটি নাই। আমি চাই, পিকআপ ড্রাইভারের বিচার হোক।’
ইশরাতের চিকিৎসায় এ পর্যন্ত ১৫ লাখ টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে। গরিব পরিবারের পক্ষে এত ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পরিবারের একমাত্র দাবি ইশরাতের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং দোষী চালক ও মালিকপক্ষকে আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায় করা। আহত মেয়েকে নিয়ে বর্তমানে চরম উৎকণ্ঠা ও চোখের জলে দিন পার করছেন মা আমেনা বেগমও।
ঘটনার পর থানায় মামলা দায়ের করা হলেও এখন পর্যন্ত চালক বা গাড়ির মালিকপক্ষকে পুলিশ খুঁজে পায়নি। তবে ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে বিআরটিএ-তে আবেদন করার পাশাপাশি এলাকাবাসী ও সহপাঠীরা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন। মানববন্ধনে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কুমিল্লা-চাঁদপুর মহাসড়কে বেপরোয়া গাড়ি চালানো এবং ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করার কারণে প্রতিনিয়ত এমন দুর্ঘটনা ঘটছে।
সড়ক দুর্ঘটনা শুধু চাঁদপুরে নয়, সারা দেশেই এক মারাত্মক চিত্র ধারণ করেছে। এর পেছনে চালকদের অসচেতনতা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল এবং সাধারণ মানুষের অসচেতনতাই প্রধান কারণ। হতাহত পরিবারগুলোকে আইনি ও প্রশাসনিক সহযোগিতা দিয়ে আসছি এবং ভবিষ্যতেও পাশে থাকবেন বলেন জানান নিরাপদ সড়ক চাই সংগঠনের সভাপতি এম. এ. লতিফ।
তিনি জানান, ‘আসলে দুর্ঘটনা প্রতিনিয়ত বাড়ছে, এটা আমাদের চাঁদপুর না, সারা বাংলাদেশের চিত্র। সেই হারে আমাদের চাঁদপুরের দুর্ঘটনা কিন্তু আগের থেকে কমে নাই। আর এই না ঘটার পেছনে রাস্তাঘাটের করুন অবস্থা, গাড়ি ঘোরার ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলছে রাস্তাঘাটে, পাশাপাশি সবচেয়ে বড় সমস্যা যেটা, ওইটা হলো জনগণের অসচেতনতা। এটাই হচ্ছে মুখ্য কারণ আমি মনে করি, যে কারণে আমাদের চাঁদপুরে পূর্বের চেয়েও এখন ডে বাই ডে দুর্ঘটনা বাড়ছে এবং এতে অনেক ধরনের হতাহত হচ্ছে।’
এমএ লতিফ বলেন, ‘আমরা অনেক সময় যারা আহত-নিহত হয়, তাদেরকে পরামর্শ দেই বা তারা যদি আমাদের থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা চায়, অফিশিয়ালি কোনো সহযোগিতা যে, অনেকে আছে খুব নিরীহ পরিবার, যারা সরকারের এই জায়গা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না, সেই সমস্ত মানুষগুলোকে আমরা পরামর্শ দেই—আপনারা আমাদের কাছে আসেন, আমরা প্রয়োজনে থেকে আপনাদেরকে সরকারের যেই জায়গায় গেলে আপনারা আপনাদের সুবিধাগুলো পাবেন, আমরা আপনাদেরকে পৌঁছে দেবো। ইতঃপূর্বে আমরা অনেককে বিআরটিএর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিভিন্ন সহযোগিতা আমরা করিয়ে দিয়েছি।’
ইশরাতের মতো আর কোনো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন যেন এভাবে রাজপথে ঝরে না যায় এটাই এখন সচেতন মহলের জোর দাবি। এদিকে চাঁদপুরে গত তিন মাসে চালক, যাত্রী ও পথচারীসহ অন্তত ১৫ জন নিহত ও অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।