নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। এখন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। নিখোঁজদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। দুর্গম পার্বত্য এলাকায় উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হলেও মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বুধবার হিমালয়ের একটি নদীর অববাহিকায় পাহাড়ের মাটি, পাথর ও বরফের বিশাল অংশ ধসে পড়ার পর আকস্মিক বন্যা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ তৈরি হয়। এতে নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী বিভিন্ন শহর, উপত্যকা ও জনপদ প্লাবিত হয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দুর্গম এলাকায় তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি আটকে পড়া মানুষদের কাছে খাবার, তাঁবু ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
নেপাল পুলিশের মুখপাত্র আবিনারায়ণ কাফলে জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযান আবারও শুরু হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও মরদেহ উদ্ধারের সম্ভাবনা থাকায় মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
নেপালে এখন পর্যন্ত ৮২৬ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৬০০ জন বিদেশি নাগরিক বলে জানিয়েছে পুলিশ ও পর্যটন কর্মকর্তারা। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ভারতের ১৭৭ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৬৩ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং কানাডার ২৫ জন রয়েছেন। এছাড়া আরও কয়েকটি দেশের নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন।
অন্যদিকে, চীনের তিব্বত অঞ্চলের গিরং কাউন্টিতে আরও ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে। তাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক।
বন্যা ও ভূমিধসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর ভিডিও ও স্থানীয়দের বর্ণনায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র উঠে এসেছে। পানি, কাদা ও পাথরের স্রোতে বাড়িঘর, সড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামো ভেসে গেছে। সীমান্ত এলাকার একটি পারাপার স্থানে বিশাল ধ্বংসাবশেষের স্রোতে মানুষ ও যানবাহন ভেসে যাওয়ার দৃশ্যও দেখা গেছে।
দুর্যোগে বেঁচে যাওয়া কয়েকজন জানিয়েছেন, মুহূর্তের মধ্যে পাহাড় থেকে কাদামাটি ও পানির ঢল নেমে আসে। অনেকেই গাছ, ভবনের ছাদ কিংবা উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়ে প্রাণ রক্ষা করেন। অনেকে পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছেন।
উদ্ধার অভিযানে ৫ হাজারের বেশি সেনা ও পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি ধ্বংসস্তূপে জীবিতদের সন্ধান ও মরদেহ উদ্ধারের কাজ চলছে। প্রতিবেশী ভারতও নেপালকে জরুরি ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে।
ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধস থেকেই দুর্যোগ
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, ভূমিকম্পের কারণে হিমবাহের একটি অংশ ধসে গিয়ে এই বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, প্রথমে যে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূকম্পন শনাক্ত হয়েছিল, সেটি প্রকৃতপক্ষে হিমবাহের পাথর ও বরফ ধসে পড়ার ফলে সৃষ্ট কম্পন। এরপর সেখান থেকে ব্যাপক ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ তৈরি হয়।
তিব্বতের গিরং এলাকায় আরও একটি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ভূমিধস ও বন্যার কারণে সীমান্ত এলাকার উজানে একটি হ্রদে পানি আটকে রয়েছে। পানির চাপ বেড়ে গেলে বা হঠাৎ হ্রদের পানি নেমে এলে নতুন করে বন্যা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে চীনা কর্তৃপক্ষ।
দুর্যোগে নিখোঁজদের অনেকেই কৈলাস-মানস সরোবর তীর্থযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন। তিব্বতের উচ্চভূমিতে অবস্থিত কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবর হিন্দু, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর কাছে অত্যন্ত পবিত্র স্থান হওয়ায় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তীর্থযাত্রী সেখানে যান।
বাড়ছে আন্তর্জাতিক সহায়তা
ভয়াবহ এই দুর্যোগে নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। যুক্তরাষ্ট্র নেপালে দুর্যোগ মোকাবিলাবিষয়ক একজন পরামর্শক পাঠানোর পাশাপাশি ৫ লাখ ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জানিয়েছেন, জাতিসংঘ ও সহযোগী সংস্থাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সহায়তায় ত্রাণসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় কর্মী পাঠাচ্ছে। কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়ে কাজ করছে।
এদিকে একটি পর্যটন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী জানিয়েছেন, তীর্থযাত্রায় থাকা ১৫ জন ভারতীয়-অস্ট্রেলীয় নাগরিকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। হেলিকপ্টারে দুর্গত এলাকা পরিদর্শনের পর তিনি জানান, অনেক এলাকায় জনবসতির কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট নেই।
দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড, বিচ্ছিন্ন সড়ক, ব্যাপক ধ্বংসস্তূপ এবং উজানে জমে থাকা পানির সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণে উদ্ধারকারীদের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ফলে অভিযান যত এগোবে, মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।