ভাস্কর্য এবং মূর্তি বিতর্ক মৌলবাদীদের রাজনৈতিক কৌশল । মূর্তি বলতে আমরা যা বুঝি , সেটা ধর্মীয় বিষয় এবং সেটাতে ধর্মীয় বিধান মেনে পূজা অর্চনা করতে হয় । মূর্তিকে ভগবান ( সৃষ্টিকর্তা কিংবা সৃষ্টিকর্তার বিশেষ প্রতিনিধি ) মনে করে , ভক্তি ও প্রণাম করে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষেরা। ভাস্কর্য একই উদ্দেশ্যে সৃষ্টি বা স্থাপন করা হয়না । যে কোন রাষ্ট্র , সে রাষ্ট্রের সৃষ্টি কিংবা অন্য কোন কারনে যারা বিশেষ অবদান রাখেন , তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা বসত সম্মান প্রদর্শনের জন্য রাষ্ট্র তাদের ভাস্কর্য স্থাপন করেন । বিশ্বে যার বহু নজীর রয়েছে । বিশ্বের প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশেই ভাস্কর্য রয়েছে , কোথাও ধর্ম বাধা হয়ে দাড়ায়নি , কারন সেখানে মূর্খরা নেতা নন । মিশরে রয়েছে সব চাইতে বেশী ভাস্কর্য । যে দেশে লেখাপড়া করে মানুষ ইসলামিক স্কলার হয়ে থাকেন । বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপন নিয়ে , মৌলবাদীরা যে আন্দোলনের চেস্টা করছেন , তার পেছনে প্রধান কারন হচ্ছে , তাদের প্রতি অতিতে নমনীয় ভাব প্রদর্শন । হাই কোর্টে ভাস্কর্য স্থাপন কালে তারা বলেছিলো , নামাজ পরার সময় , জাতীয় ঈদগাহ হতে নারীমূর্তি দেখা যাবে , তাই এটা সরাতে হবে । এখন তারা বলছে , বাংলাদেশের কোথাও কোন ভাস্কর্য স্থাপন করা যাবেনা । অথচ ইতিমধ্যে বাংলাদেশে বহু ভাস্কর্য স্থাপিত হয়েছে এতো দিন তারা কিছুই বলেননি !
এবারো যদি তাদের প্রতি নমনীয় ভাব দেখানো হয় , অচিরেই তারা বলবে , ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার ভাস্কর্য থেকে শুরু করে সকল ভাস্কর্য উচ্ছেদ করতে হবে , কারন এগুলো হচ্ছে তাদের ভাষায় মূর্তি !! এক পর্যায়ে তারা বলবে কোন সরকারী অফিস আদালতে কোন ছবি রাখা যাবেনা , কারন ছবি রাখা হারাম । গার্মেন্টসে নারী পুরুষ এক সাথে কাজ করতে পারবেনা , মরহুম শফি হুজুর বলে গেছেন , গার্মেন্টস জেনার কারখানা ! বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে যার অবদান যতো বেশী , মৌলবাদী চক্রের ঘৃণাও তাঁর প্রতি ততোই বেশী । এরা এক সময় হিন্দু- মুসলিম দ্বন্দ্ব উস্কে দিয়ে , দাঙ্গা করাবে । ধর্মকে রাজনীতির বাহনরূপে ব্যবহার করে এরা ক্ষমতা গ্রহনের চেস্টা করবে । এবং কোন কারনে একবার ক্ষমতায় যেতে পারলে , এরা বলবে , ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তির বিরোধিতা করা হারাম। ইসলামে ভোটের বিধান নাই ।
নারীরা রাজনীতিতো দুরের কথা , ঘরের বাইরেই যাওয়া হারাম। সরকারের বিরোধী পক্ষ থাকবেই । কিন্তু বিরোধী পক্ষ কারা হবে , সে বিষয়েও একটি নীতিমালা বা সিদ্ধান্ত থাকা উচিৎ । বানরকে প্রশ্রয় দিলে মাথায় উঠবেই । এটাকে বানরের দোষ বলা যাবেনা। ধর্ম নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে জন্মনেয়া একটি রাষ্ট্রে এতো মৌলবাদী কেমন করে সৃষ্টি হলো তাও ভেবে দেখা উচিৎ । ধর্ম নির্ভর রাজনীতির প্রতিপক্ষ হচ্ছে গণতন্ত্র , বাক ব্যক্তি ও সংবাদের স্বাধীনতা , বিচক্ষণ সেনাবাহিনী , উন্নত শিক্ষায় শিক্ষিত বিচক্ষণ আমলা ও পুলিশ প্রশাসন এবং ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড । প্রতিটি প্রজন্মকে নাগরিক অধিকার সচেতন ও দেশপ্রেমী এবং ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি সম্মানবোধ নিয়ে বড় হতে না শিখালে , তারা ধর্মের ভিত্তিতেই সব কিছু বিবেচনা করবে এটাই স্বাভাবিক । আমাদের কলেজ বিশ্ব বিদ্যালয় পর্যায়ে রাজনীতি চর্চা নেই বললেই চলে। যারা রাজনীতির সাথে জড়িত , তারা রাজনীতি বলতে বুঝে কর্মসূচীতে অংশ গ্রহণ এবং নিজের লাভ ! রাজনীতিতে আদর্শ চর্চার স্থান সংকুচিত হয়ে আসছে দিন দিন ।
একজন ছাত্রনেতা মনে করেননা যে ভবিষ্যতে তাঁর এমপি মন্ত্রী হয়ে , দেশের জন্য ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে !! কারন এ সকল পদ গুলোতে উত্তরাধিকার কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাড়াচ্ছে । তাই মেধাবী কোন ছাত্র এ পথে পা বারাবার মতো বোকামি করছে না। এক ছাত্র কর্মীকে বল্লাম , তুমি বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কি জানো ? সে বললো তিনি আমাদের প্রাইম মিনিস্টারের ফাদার ! সেও হয়তো অচিরেই কোন পদ পদবী পেয়ে যাবে !! এভাবে গড়ে উঠা প্রজন্মের পক্ষে মৌলবাদী চক্রের মোকাবেলা কিভাবে সম্ভব হবে ? মৌলবাদী চক্রের অপ-রাজনীতির জবাব এরা কিভাবে দিবে ? ধর্ম কোন একটি রাষ্ট্রের বিষয় নয়। ধর্মের কোন ভৌগুলিক সীমারেখা নেই । হজরত শাহ জালাল , শাহ পরান সহ হাক্কানী আলেমরা নিজ দেশের বাইরে এসে অন্য এলাকায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা করে গেছেন বলেই , আমরা এখন মুসলমান । তাঁরা এ অঞ্চলে না আসলে আমরা মুসলমানের ঘরে জন্মাতাম কি-না সন্দেহ । আমাদের দেশের গলাবাজি করা ধর্মীয় নেতারা আশে পাশের অমুসলিম দেশ যেমন – চিন , ভারত , নেপাল , শ্রিলংকা , ভুটানে অনায়াসে ছড়িয়ে পরে , তাদের মুসলমান বানানোর চেস্টা করতে পারেন। মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে , ক্ষমতায় যাওয়ার চেস্টা হচ্ছে দুনিয়াবি চিন্তা । মানুষ যদি নাও বুঝেন , আল্লাহ্ অবশ্যই বিষয়টি বুঝেন , হাশরের মাঠে তারা বিপদে পরতে পারেন । মাত্র বছর খানেক আগে চর্মনাই হুজুর বক্তব্যে বলেছেন , নৌকায় ভোট দিলে হাসিনায় পাবে , ধানের শিষে দিলে খালেদাজিয়া পাবে আর আমার পাংক্ষা মার্কায় দিলে আমার রসুল ভোটটি পাবে !!
নিজের স্বার্থে নবীর সাথে তোলনা করলেন , নবীর উম্মতদের ! একই কাজ আমি সাইদী সাহেবকেও করতে দেখেছি । কুমিল্লা টাউন হল মাঠে তফসিরুল কোর আন মাহফিল করে তিনি বলেছেন – অই আওয়ামীলীগ কর্মীরা তোমরা কি বলতে পারবে তোমাদের নেতা শেখ মুজিব কোন দিন পরনারীর হাত ধরেনাই ? বলতে পারবে বিএনপি নেতারা , জিয়াউর রহমান কোনদিন পরনারীর হাত ধরেনাই ? আমি বলতে পারব , আমার নেতা হজরত মুহাম্মদ সাঃ কোনদিন পর নারীর হাত ধরেনাই !! কার সাথে কাদের তোলনা করলেন !! নবীর উম্মতদের নবীজির সাথে তুলনা করা কিভাবে সম্ভব হলো ! তিনি তাঁর নেতা গোলাম আজম , নিজামী , মুজাহিদি কিংবা কাদের মোল্লাদের কথা কিন্তু বলেননি । এটাই মৌলবাদী চক্রের চালাকি । তবে আশার কথা হচ্ছে , বাংলাদেশের মৌলবাদীরা ভন্ড মৌলবাদী , এটা একদিক থেকে ভালোই , এরা ক্ষমতার জন্য ধর্মের কথা বলে ! এরা মাদ্রাসাভিত্তিক শিশু ধর্ষণের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেনা । নিশ্চয়ই এর পেছনেও যৌক্তিক কারন আছে !! মাদ্রাসায় পরা এই শিশুরা বড় হয়ে নিজেরা শিক্ষক হবে এবং এ ঘটনা তারাও ভবিষ্যতে ঘটাবে।
এমন স্বপ্নও অনেক শিশু হয়তো দেখছে ! এটা হয়ে গেছে মাদ্রাসা ছাত্রের জীবন চক্র !!
বহু হুজুরই হুরের চাইতে গেলমান বেশী পছন্দ করেন ।
তবে বেশীর ভাগ হুজুরই প্রকৃত ধার্মিক । প্রকৃত ধার্মিক কখনো হিংস্র হয়না , তারা কাউকে হাত কিংবা জবানের মাধ্যমে আঘাত করেনা। তারা দুনিয়ার জীবন মেহমানের মতোই কাটিয়ে দেয় । ‘ধার্মিক মানুষরা চাপাতি বা ছুরি নিয়ে ঘুরে না ।
বাংলাদেশকে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে মাথা তুলে দাড়াতে , কিংবা রাষ্ট্রের ধর্ম নিরপেক্ষ চরিত্র ধরে রাখতে , সুরাজনীতি , সুশাসন , সুশিক্ষা , সুচিকিৎসা সহ রাষ্টের বহু শাখায় সুচিন্তিত ভূমিকা রাখতে , রাষ্ট্র যথেষ্ট সফলতা দেখাতে পারেনি ।
বাংলাদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্র হতে দিতে না চাইলে , অনতিবিলম্বে মৌলবাদের লাগাম টেনে ধরতেই হবে । কারণ ইতিমধ্যেই বহু ভুল এবং দেরী হয়ে গেছে।
লেখক- সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।