ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর অশ্রুসিক্ত আবেগে বিদায় জানানো হলো মুন্সীরহাট জি এন্ড এ আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক কাজী মো. ছিদ্দিকুর রহমানকে। দীর্ঘ ৩৯ বছরের গৌরবময় শিক্ষকতা জীবনের ইতি টেনে বুধবার (১৫ জুলাই) তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর গ্রহণ করেন।
এ উপলক্ষে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত বিদায় সংবর্ধনা পরিণত হয় এক আবেগঘন মিলনমেলায়। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক ও এলাকাবাসী একত্রিত হয়ে প্রিয় শিক্ষককে ফুলেল শুভেচ্ছা, সম্মাননা স্মারক ও ভালোবাসায় বিদায় জানান।
সকাল থেকেই বিদ্যালয়ে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা হাতে ফুল, স্মৃতিচারণের ছবি ও অগণিত ভালোবাসা নিয়ে ছুটে আসেন প্রিয় শিক্ষককে শেষবারের মতো সম্মান জানাতে। বিদায়ের মুহূর্তে অনেকের চোখে ছিল অশ্রু, কণ্ঠে ছিল আবেগ; পুরো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ যেন এক আবেগঘন পরিবেশে স্তব্ধ হয়ে যায়।
অনুষ্ঠানে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য, শিক্ষক-শিক্ষিকা, বিভিন্ন ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা বলেন, কাজী মো. ছিদ্দিকুর রহমান শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি ছিলেন হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্নের কারিগর, একজন অভিভাবক, পরামর্শদাতা ও মানবিক মূল্যবোধের আলোকবর্তিকা। তার হাত ধরে অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রতিষ্ঠিত।
বিদায়ী শিক্ষক স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “আমি জীবনে অনেক সম্মান পেয়েছি, কিন্তু শিক্ষার্থীদের ভালোবাসার চেয়ে বড় অর্জন আর কিছু নেই। একজন শিক্ষক হিসেবে আমার সবচেয়ে বড় তৃপ্তি—আমার ছাত্রছাত্রীরা মানুষ হয়েছে, সমাজে ভালো কাজ করছে। তোমরা সততা, নৈতিকতা ও মানবিকতা ধরে রাখবে; এটাই আমার শেষ অনুরোধ।”
তিনি আরও বলেন, শিক্ষকতা শুধুমাত্র একটি পেশা নয়; এটি মানুষের জীবন গড়ার এক মহৎ দায়িত্ব। আগামী প্রজন্মকে আদর্শবান ও সুশিক্ষিত নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি শিক্ষক ও অভিভাবকদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
সহকর্মীরা বলেন, কাজী মো. ছিদ্দিকুর রহমানের কর্মনিষ্ঠা, সময়ানুবর্তিতা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা বিদ্যালয়ের প্রতিটি মানুষের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। বিদ্যালয়ের উন্নয়ন, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় তার অবদান চিরস্মরণীয়।
প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা স্মৃতিচারণ করে বলেন, জীবনের কঠিন সময়ে তিনি শুধু পড়াশোনার দিকনির্দেশনাই দেননি, বরং সাহস, আত্মবিশ্বাস ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিয়েছেন। আজ তারা যে যার অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত হলেও স্যারের শেখানো আদর্শই তাদের পথচলার প্রেরণা।
অনুষ্ঠানের শেষপর্যায়ে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বিদায়ী শিক্ষককে সম্মাননা স্মারক ও ফুলেল শুভেচ্ছা প্রদান করা হয়। উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে তাকে সম্মান জানান। অনেক শিক্ষার্থী স্যারের হাত ধরে দোয়া নেন, কেউবা অশ্রুসিক্ত চোখে শেষবারের মতো স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তোলেন।
৩৯ বছরের কর্মজীবনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও কাজী মো. ছিদ্দিকুর রহমানের শিক্ষা, আদর্শ ও মানবিক মূল্যবোধ মুন্সীরহাট জি এন্ড এ আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিটি প্রজন্মের মাঝে চিরকাল বেঁচে থাকবে। একজন শিক্ষক অবসরে যান, কিন্তু তার আদর্শ কখনো অবসর নেয় না।