আমার এক বৌদি মিসেস হালদার কদিন আগে কথায় কথায় বলেছিলেন ‘ঈশ্বর-আল্লাহ-ভগবান’ আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীটাকে আমাদের জন্য নিজ হাতে বানিয়ে দিয়েছেন। বাসযোগ্য করার জন্য খাল-বিল, নদী-নালা, বন-বনানি গাছপালা, ফল-ফলাদি পশুপাখি, দুধ-ভাত-মাছ, সুদিন-বর্ষা, কত কিছু দিয়েছেন। আমরা তার বান্দারা মেরে-কেটে খেয়ে সব সাবাড় করে নিজেরাই নিজেদের জন্য বিপদ ডেকে এনেছি। একে কোভিড বলি আর করোনা বলি এ তো আসমানি বালা, প্রকৃতির প্রতিশোধ। কাকে দোষ দেব আমরা? কাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাব?
তার কথা ভাবছিলাম। সত্যিই তো এই বিপদ আমরাই ডেকে এনেছি। এই ঢাকা শহরের ৮০টির মতো খাল ছিল, যেগুলো ভরাট করে বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বানানো হয়েছে। কেবল শহরে নয়, গ্রামগঞ্জেও খাল-বিল নদী-নালা বনাঞ্চল সাবাড় করে সুখের সংসার গড়তে গিয়ে দুঃখের বসত বানিয়েছি। কিন্তু সুখ নামের বাসরটি আজ করোনার নিরাপদ ঘরবাড়ি। যারা এই কর্মটি করে চলেছে তারাও মানুষ নামের জীব। আমাদের সমাজে তাদের বলা হয় ভূমিদস্যু। সম্ভবত তাদের ধারণা মৃত্যুর পর এখান থেকে কিছু অর্থ সম্পদ আর ঘরবাড়ি নিয়ে যাবেন ওপারে সুখে থাকবেন, জানি না এমন কি কেউ ভাবেন কি না। নইলে অন্ধকার পথে হাজার হাজার কোটি টাকা বানানোর কি সার্থকতা? সত্যিই আমরা পরকালের কথা ভাবলে বা একদিন যে মরতে হবে এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে নাহি যেতে চাইলেও যেতে হবে, যাবার পর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে, ১০, ২০, ৫০, ১০০ বছরের জীবনের হিসাব দিতে হবে। ওখানে জামিন পাওয়া যাবে না, মামলা খারিজের সুযোগ নেই। তবু আমরা কেন এত অপকর্ম করছি। নিজেরাই নিজেদের জন্য বিপদ ডেকে আনছি।
অবশ্য একে বিপদ না বলে মহাবিপদ বলাই যুক্তিযুক্ত। এই লেখা যখন লিখছি তখন শুক্রবার বিগত ২৪ ঘণ্টায় খবর হলো ২০ জন মারা গেছেন, তার আগের ২৪ ঘণ্টায় ৩৭ জন, তার আগের ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন ৩৮ জন, গত ২২ দিনে মারা গেছে ৫০০ জন। এইভাবে মৃত্যুর সংখ্যা সাড়ে ৬ হাজার ছাড়িয়েছে। এ লেখা যখন লিখছি তখন মোবাইলে প্রেসক্লাব সভাপতি সাইফুল আলমের মেসেজ: “JPC Sr. Member Humayun saleque chowdhury (60) died this evening at DMCH (Innalillahi wa Innalillahi rajiun”. যখনই মোবাইল টিং করে বেজে ওঠে তখন বুক ধুক ধুক করে এই বুঝি মেসেজ এল- Jatiya press club is shockingly by inform you the sad demise of…এইভাবে প্রেসক্লাবের অন্তত ২০ জন সদস্য কোভিডের শিকার হয়েছেন। টেলিভিশন অন করে দেখলাম নন্দিত নাট্যজন আলী যাকের আর নেই। প্রেসক্লাবে কোনের টেবিল একটি আড্ডার টেবিল। বসে চা খেতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা মারতাম। আমাদের আড্ডার অন্যতম সাথি ছিল খন্দকার মোজাম্মেল হক (গেদু চাচা)। বড়ই মজার লোক ছিলেন। অন্য অনেকের মতো অর্থহীন বকবক করতেন না। মাঝেমধ্যে একটা-দুইটা ছাড়তেন, তাতেই সবার মুখ খানিকের জন্য হলেও বন্ধ হয়ে যেত। পেটে খিল ধরত। আমাদের সেই গেদু চাচা চলে গেলেন।
গেদু চাচা ছিল তার পেন নেম। তিনি ‘আজকের সূর্যোদয়’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। পত্রিকাটি গেদু চাচার হাস্য রসাত্মক অথচ সিরিয়াস পলিটিক্যাল বক্তব্যের জন্য খুবই জনপ্রিয় ছিল। গেদু চাচা কলামটি জাদুর মতো সব বয়সের পাঠককে আকৃষ্ট করত। কলামটির মতোই ছিল তাঁর আড্ডার কথাবার্তা। মেকআপ-গেটাফে মনে হতো অতিসাধারণ পত্রিকা এবং কাঁচা হাতে সম্পাদনা। কিন্তু না বাঘা বাঘা বুদ্ধিজীবীরাও পত্রিকাটি হাতে পাবার জন্য অপেক্ষা করতেন। মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন (বিএলএফ) , মুক্তিযুদ্ধ ভাঙ্গিয়ে চলতেন না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বঙ্গবন্ধুকে মনে ধারণ করতেন। কোনের টেবিলে যেদিন আমি, শামসুদ্দিন পেয়ারা, আতিক মামু, জাহিদুজ্জামান ফারুক, গেদু চাচা অর্থাৎ সিনিয়র বন্ধুরা বসতাম, তখন কখন যে দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে যেত, তখন মুয়াজ্জিনের আজান আর মুসলিমের চা আসত, বুঝতাম কয়েক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। অতি সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। জানি না তার পরিবার আজ কেমন আছে। দু-তিন দিন আগে চলে গেছেন দৈনিক সংবাদ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুনীরুজ্জামান। আমাদের বন্ধু প্রেসক্লাবে কম আসতেন, সংবাদই ছিল তার ঘরবাড়ি আড্ডার জায়গা। আমাদের আড্ডার সদস্য ছিলেন নাসিমুন আরা হক মিনু, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সহপাঠী বন্ধু। সেই বন্ধুত্ব আজও এতটুকু ম্লান হয়নি। এখনো মনে হয় সেই ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে পাশাপাশি হাঁটছি, স্লোগান দিচ্ছি ‘জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো’ ‘৬ দফা মেনে নাও নইলে গদি ছেড়ে দাও’, ‘১১ দফা মেনে নাও নইলে পাকিস্তানে পালাও’ ‘জিন্না মিয়ার পাকিস্তান-আজিমপুর গোরস্থান’ ‘বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি-বুঝে নাও দুর্বৃত্ত’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ ‘জয় বাংলা’ সদা। হাসিখুশি আমাদের এই বন্ধুটি বেশ কিছুদিন প্রেসক্লাবে আসেন না। তার জীবনসঙ্গী আমাদের প্রিয় হাসনাত ভাই চলে গেছেন কদিন আগে। তিনি একাধারে লেখক, সম্পাদক, সংগঠক, প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী এবং মুক্তিযোদ্ধা। এইভাবে আমাদের কাছের মানুষগুলো একে একে সব চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে যাদের বয়স ৫০ থেকে ৬০, ৬০ থেকে ৭০, ৭০ থেকে ৮০ এবং ওপরে। কবে আমাদেরও ডাক আসবে জানি না। এলেও ফেরানো যাবে না। তাই আসুন একে অপরের জন্য আল্লাহর দরবারে হাত তুলে দোয়া করি যেন তাঁর সন্তুষ্টি নিয়ে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পারি।
এখন কোভিডের দ্বিতীয় ছোবল চলছে। মনে হয় এটি প্রথমটির চেয়েও হিংস্র। দিনে দিনে আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা প্রতিদিন জাতিকে কোভিড মোকাবিলা করার সঙ্গে সঙ্গে বেঁচে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। গণভবনে থেকে ভার্চ্যুয়াল প্রেস কনফারেন্স করছেন, মন্ত্রিপরিষদের মিটিং করছেন, একনেকের বৈঠক করছেন, ত্রাণকাজে বা চিকিৎসায় জড়িতদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, উন্নয়ন কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন, প্রকল্পের কাজ শেষ করে উদ্বোধন করছেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করছেন। সবার আগে কোভিডের ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য হাজার কোটি টাকা এডভান্স করেছেন। এতটুকু বিশ্রাম নেই কেবল কাজ আর কাজ। আসুন আমরা সবাই তাঁর সুস্থ দীর্ঘ জীবন কামনা করে আল্লাহর দরবারে দোয়া করি। তাকে যে আমাদের জন্য ভালো থাকতে হবে।
আমাদের সাংবাদিকতার লিজেন্ড একুশের মহান গানের রচনাকার আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বলেছেন ভ্যাকসিন কোনো পার্মানেন্ট সলিউশন নয় অর্থাৎ এক দিনে সব দূর হবার নয়। ভ্যাকসিন প্রয়োগের ফলে সংক্রমণ অনেক কমে যাবে। হয়তো আবার দেখা দেবে- এভাবে দীর্ঘদিন কোভিডের সংক্রমণ থাকবে। এইভাবে একদিন শেষ হয়ে যাবে। যেভাবে কলেরা বা ওলাউটা অথবা বসন্ত রোগ ভ্যাকসিনে কমতে কমতে একদিন শেষ হয়ে যায়। আজ আর কলেরা কোনো মরণব্যাধি রোগ নয়। নিকটবর্তী ক্লিনিকে নিতে পারলেই হলো। তেমনি খুব কম বয়সেই বসন্তের টিকা দিলে তার জীবনে আর বসন্ত রোগ হবার নয়।
কিন্তু কোভিডের সমস্যা হলো এর ভাইরাসটি বা জীবাণু যে কী, তার সকল রহস্য ্আজো কোনো বিজ্ঞানী আবিষ্কার করতে পারেননি। এই মুহূর্তে বিজ্ঞানে তথা চিকিৎসাবিজ্ঞানে বা অনুজীব বিজ্ঞানে কত নোবেল লরিয়েট রয়েছেন, কত ল্যাব রয়েছে তাদের একজন মানুষের ওজন তো এক একটি দেশ বা মহাদেশের মতোই, তবু তারা বসে বসে মাথার চুল ছিঁড়ছেন, শতভাগ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছেন না। ভ্যাকসিনের কথা শোনা যাচ্ছে দেশে-দেশে তাও কোনোটা ৯০ শতাংশ কোনোটা ৯৫ শতাংশ কাজ করতে পারবে। ১০০ শতাংশ কাজ করার ভ্যাকসিন এখনো কেউ আবিষ্কার করতে পারেনি। এমনকি একটি সংবাদে দেখলাম বিশ্বের বিস্ময় বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং ৫-৬ বছর আগেই এই মহামারির ইঙ্গিত দিয়েছেন। সমাধান দিতে পেরেছিলেন কি না জানি না। শুনিনি এখনো।
আমাদের দেশে পীর-ফকির-সাধু আছে যারা, একখানা ফুঁ দিলে কিংবা একটু পানি পড়া বা একখানা তাবিজ মাদুলি পরিয়ে দিলে সব রোগব্যাধি, সংকট দূর হয়ে যায়। কেউ তাবিজ স্বপ্নে পেয়েছেন কেউ হিমালয়ে সাধনা করতে করতে রোগ নিরাময়ের ওষুধ অলৌকিক পদ্ধতিতে হাসিল করেছেন। পানি পড়া প্রদানকারীরা পোশাকে-আশাকে একেকজন দেখতে হুজুর। পানি পড়া দানকারীদের মধ্যে নারীও রয়েছেন। হিন্দু সাধুরা হিমালয়ে ২-৩ যুগ তপস্যা করে চুল-দাড়িতে জট বাঁধিয়ে এবং হাতে গলায় বড় বড় দানার মালা পরে এবং পরনে কটকটে লাল সালুর জামাকাপড়ে এমনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেন যে, যে কেউ দুর্বল বা ভক্ত হতে বাধ্য। তারাও কোভিড-১৯ বা করোনার কী ব্যবস্থা দিলেন, আজ পর্যন্ত জানি না। তবে মানুষের রোগব্যাধি নিরাময় হোক না হোক তাদের তেজুরি ভরতে বেশি দিন লাগে না। আর নারী কেলেঙ্কারির তো অন্ত নেই।
তবে আমি বিশ্বাস করি, এই আসমানি বালা প্রকৃতির প্রতিশোধে এসেছে, আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নিরাময়ের ওষুধ পাঠাবেন। আমিন।
ঢাকা, ২৭ নভেম্বর, ২০২০
লেখক: এমপি, সদস্য- মুজিববর্ষ জাতীয় কমিটি, সাবেক সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেসক্লাব
ই-মেইল: balisshafiq@gmail.com
