
মাদরাসা জাতীয়করণ সময়ের দাবী


জাতীয় জীবনে অনেক ঐতিহাসিক চড়াই উৎরাই, রাজনৈতিক পরিক্রমায় আন্দোলন, সংগ্রাম, সংকট-অস্থিরতার দোলাচাল ও নানা পটপরিবর্তনের মধ্যদিয়ে ২০২১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ ৫০ বছরে পদার্পণ করেছে। পালিত হয়েছে সুবর্ণজয়ন্তী। ভাবতে ভালোই লাগছে।
ইতোমধ্যে খাদ্য নিরাপত্তা ,জ্বালানি নিরাপত্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ও আর্থিক স্বচ্ছলতা এসেছে দেশটির একথা বলা যায়। ঈর্ষণীয় জিডিপি সূচক। ক্রমবর্ধমান মাথাপিছু আয়। শিক্ষা ব্যবস্থায় যুগান্তকারী নানা পদক্ষেপ বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। প্রতিটি উপজেলায় ন্যূনতম একটি করে স্কুল ও একটি করে কলেজ জাতীয়করণ করার সিদ্ধান্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় সময়ের সাহসী ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। এতোকিছু অগ্রগতির মধ্যেও মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার একি হাল! বিষয়টি নিয়ে ভাববার এখনই উপযুক্ত সময়।
আজকের আলোকপাত মাদরাসা শিক্ষা জাতীয়করণ প্রসঙ্গে । দেশে মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরন-আঙ্গিক বিদ্যমান। যেমন এমপিওভুক্ত আলিয়া মাদরাসা (দাখিল,আলিম, ফাজিল, কামিল), স্বতন্ত্র এবতেদায়ি মাদরাসা, কওমী মাদরাসা, ফোরকানিয়া মাদরাসা, নুরানী মাদরাসা ও হাফিজিয়া মাদরাসা।


৪৮ বছর ধরে খুঁড়িয়ে চলা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার হাজারো রুপ। আছে সরকারি বেসরকারির মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য । বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। এখনো সরকারি সহযোগিতা ও নজরদারির বাহিরে রয়েছে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যে যার মতো কারিকুলাম তৈরী করে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছে। হাজারো সমস্যায় জর্জরিত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এতোদিন নীতিহীন ছিল। রাষ্ট্রীয় দর্শন ও জাতীয় চাহিদা অনুযায়ী দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর উপায় ও অবলম্বন হলো শিক্ষানীতি। সর্বশেষ ২০১০ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় শিক্ষানীতি চালু হলে জাতির কংলঙ্ক মোচন হয়।
কিন্তু এই শিক্ষানীতি কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে তা ভেবে দেখা দরকার। যদিও উল্লেখিত শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন কাল ধরা হয়েছে (২০১০ – ২০১৮) পর্যন্ত। বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন শিক্ষানীতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে বেসরকারি শিক্ষকদের প্রাণের দাবী পূরণ হবে বলে ধারণা করা যায়। পৃথিবীর বহু দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা গবেষণা -বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয়েছে যে,আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শ্রেণিকক্ষে আইসিটির ব্যবহার ও শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ে দারুণ অগ্রগতি হলেও একথা বলা বাহুল্য স্কুল কলেজের ন্যয় মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা সরাসরি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা তথা জাতীয়করণে একেবারেই পিছিয়ে।
দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়গুলোর জাতীয়করণের ধারা অব্যাহত থাকলেও মাদরাসার ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম। সাধারণ শিক্ষার সাথে সঙ্গতি রেখে ধর্মীয় শিক্ষাদান করে যাচ্ছে এবতেদায়ি, দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল স্তরের মাদরাসাসমুহ যার বিরাট অংশ এমপিওভুক্ত।
এছাড়াও সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত স্বতন্ত্র এবতেদায়ি মাদ্রাসা রয়েছে।
বিগত ১০ বছর সময়কে মাদরাসা শিক্ষার স্বর্ণযুগ বলা হয়ে থাকে। এসময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শত বছরের দাবি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, কওমী সনদের স্বীকৃতি, মাদরাসা পর্যায়ে অনার্স কোর্স চালু, ভৌতকাঠামোগত উন্নয়ন, উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাদরাসা এমপিওভু্ক্তি ও মাদরাসা শিক্ষাকে আধুনিকায়ন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ও অনুদান প্রাপ্ত মাদরাসাগুলো বরাবরই জাতীয়করণের দাবি জানালেও দেশে সরকারি মাদরাসার সংখ্যা কাগজে-কলমে ৪টি হলেও বাস্তবে ৩টি। এর মধ্যে-রয়েছে সিলেট আলিয়া মাদরাসা, বগুড়া মুস্তাফাবিয়া আলিয়া মাদরাসা এবং ঢাকার সরকারি -ই- আলিয়া মাদরাসা । আরেকটি হচ্ছে রাজশাহী আলিয়া মাদরাসা । এটি হাজী মুহাম্মদ মুহসীনের দানে প্রতিষ্ঠিত। বর্তমানে এখানে উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। পক্ষান্তরে সরকারিভাবে স্বীকৃত মাদরাসার সংখ্যা ১৫ হাজারের অধিক এবং কর্মরত শিক্ষকের সংখ্যা দেড় লক্ষাধিক।
শিক্ষা ব্যবস্থার বিরাট একটি অংশকে আধুনিকায়ন করে জাতীয়করণের বাহিরে রেখে শিক্ষার গুনগত মান কিভাবে বৃদ্ধি করা যায় তা বোধগম্য নয়। নিশ্চয়ই মাদরাসা শিক্ষকদের প্রাণের দাবিটি উপেক্ষিত থাকা কারো কাম্য নয়।
দেশে অনেক মেগা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় যা একটি নির্দিষ্ট এলাকায় প্রভাব ফেলে কিন্ত মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করলে সমগ্র জাতির উপর প্রভাব ফেলবে বৈকি। একথা সত্য যে,আমাদের শিক্ষার হার বেড়েছে, শিক্ষায় সহায়তা বাড়ানো হয়েছে (বৃত্তি, উপবৃত্তি, খাদ্য প্রদান ,বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক, অবৈতনিক শিক্ষা) শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এসেছে ও শিক্ষাখাতে বার্ষিক বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সাহসী পদক্ষেপে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হলেও মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো জাতীয়করণের আওতার বাহিরে। শিক্ষকদের মাঝে বঞ্চনার ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার । তবে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে বর্তমান সরকারের যে প্রচেষ্টা তা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে সবার জন্য সুখকর হবে। দেশপ্রেম এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ , নৈতিক চরিত্রে বলীয়ান বুদ্ধিদীপ্ত জাতি বিনির্মানে মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা যে ঐতিহাসিক অবদান রেখে চলেছে তা যথার্থ মূল্যায়নের এখনই সময়। মাদরাসা জাতীয়করণই হোক এর উত্তম মাপকাঠি।
মোহাম্মদ আরিফ ইমাম
প্রভাষক, ইংরেজি
বেলচোঁ কারিমাবাদ ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসা
সাধারণ সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএমজিটিএ
ও
দপ্তর সম্পাদক, বাংলাদেশ মাদরাসা জেনারেল টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমজিটিএ) কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি।


























