করোনা প্রতিরোধে চাই সচেতনতা ও মনোবল

Default User
গাজী সালাহউদ্দিন
আপডেটঃ জুন ৭, ২০২০ | ১:০৮
Link Copied Successfully!

আমরা একটি খারাপ সময় অতিবাহিত করছি। করোনা বিপদ আমাদের আরও সন্নিকটে। ইতিমধ্যে করণায় শুরু হয়ে গেছে মৃত্যুর মিছিল। করোনার বাহিরেও মৃত্যুর সংখ্যা কম নয়। কিছু কিছু মৃত্যুর পিছনে ভয় আতঙ্ক কাজ করছে। যদিও এগুলি মানুষ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে পারছে না। তাই এই মুহূর্ত থেকে আমাদের আরো সচেতন ও সতর্ক হওয়ার বিকল্প নেই। সাথে মনোবল অবশ্যই রাখতে হবে। করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রধান উপায় হিসেবে সারা বিশ্বই বেছে নিয়েছিল হোম কোয়ারেন্টাইন অর্থাৎ নিজ বাসায় অবস্থান করা। কিন্তু হোম কোয়ারেন্টাইন না মানার কারণে আমাদের দেশে করোনা রোগী আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। চাঁদপুর জেলায় প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় মতলবে। এরপর থেকে নিয়মিত জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। জেলায় গত ৪ মে পর্যন্ত চাঁদপুর মোট ২২ জন আক্রান্ত হয়। এছাড়াও করোনা উপসর্গ নিয়ে একাধিক মানুষের মৃত্যুর খবর পত্র-পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।

বর্তমানে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হয়ে গেছে। গতকাল ৫ জুন শুক্রবার পর্যন্ত সিভিল সার্জন চাঁদপুর এর তথ্য সূত্র মতে, চাঁদপুর জেলায় মোট আক্রান্ত ২৫৮ জন। এরমধ্যে চাঁদপুর পৌর এলাকায় ১১৯ জন ও সদর উপজেলায় ১০ জন সহ চাঁদপুর সদরে ১২৯ জন, ফরিদগঞ্জে ৪১ জন, হাজিগঞ্জে ১৯ জন, হাইমচরে ৫ জন, কচুয়ায় ১৬ জন, শাহারাস্তিতে ১৯ জন, মতলব দক্ষিণে ১৬ জন ও মতলব উত্তরে ১৩ জন। এরমধ্যে মোট মৃত্যু ২০ জন।

যেখানে সারা বিশ্ব এই করোনা ভাইরাসের চিকিৎসা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে আমাদের দেশে এই ভাইরাসের চিকিৎসা দুরূহ ব্যাপার এটা মানতেই হবে। হাসপাতালগুলো থেকে ভালো চিকিৎসা আশা করাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। চিকিৎসার নামে আসলে কতটুকু বা কি চিকিৎসা হচ্ছে তা বাইরে থেকে আমাদের বোঝার কোন উপায় নেই। তবে ইতিমধ্যে যারা এ ধরনের রোগী নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়েছেন, তারা তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন। তাদের মুখ থেকেই শোনা যাচ্ছে যে আসলে করোনা ভাইরাসের চিকিৎসা হাসপাতালগুলো ভালোভাবে দিতে পারছে কি না!

বিজ্ঞাপন

এদেশে করোনা রোগী সনাক্ত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের প্রত্যেক জেলা উপজেলা প্রশাসন অক্লান্ত পরিশ্রম করে মানুষকে সচেতন করেছেন, ঘরে রাখার চেষ্টা করেছেন, কোনো বাধা-বিপত্তি মানুষকে ঘরে রাখতে পারেনি। প্রশাসন থেকে বারবার বলা হচ্ছিল সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং নিজের ও নিজের পরিবারের নিরাপত্তার জন্য ঘরে থাকা। কিন্তু মানুষ কোন কথা শুনে নি। প্রত্যেক জেলায় উপজেলায় প্রশাসন অক্লান্ত পরিশ্রম করার পরেও মানুষের অবহেলার কারণে শেষ পর্যন্ত সবকিছুই ভেস্তে গেছে।

এলাকাবাসী প্রশাসনের লোকজনদেরকে ফাঁকি দিয়ে কেউ প্রয়োজনে, কেউ অপ্রয়োজনে, বিভিন্ন অজুহাতে বেরিয়েছেন। আর গ্রামগঞ্জে চায়ের দোকানে তো নির্বাচনের মত আড্ডা জমিয়েছেন। সচেতনদের মধ্যে অনেকেই বুঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন।

সরকার স্বল্পআয়ের লোকদের খাদ্য সামগ্রী দিয়ে ঘরে রাখার জন্য চেষ্টা করলেও তারাও কোন বাধা বা অনুরোধ রক্ষা করেনি। খাদ্য সামগ্রী বিতরণের পরেও দেখা গেছে রিকশাচালক, ভ্যানচালক, অটোরিকশা চালক, সিএনজি চালক, সবাইকে যার যার কাজে ফিরে আসতে দেখা গেছে। যারা ভিক্ষাবৃত্তিতে ছিল, তাদেরকেও যার যা সামর্থ অনুসারে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।এর পরেও অনেককেই পরদিন তার সেই নিজ কর্মে ফিরে আসতে দেখে বিস্মিত হয়েছি। মানুষ রুটি রুজির জন্য যতটা উদ্বিগ্ন হয়েছেন ততটা করোনা ভাইরাসের জন্য নয়।

বিজ্ঞাপন

দেশে করোনা ভাইরাস সনাক্ত হওয়ার পর থেকে যখন স্কুল কলেজ সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, মুদি দোকান ওষুধের দোকান কাঁচাবাজার বাদে বাকি সব দোকান বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে, তখন থেকেই দেখছি বাজারে কিছু সংখ্যক মানুষ রিক্সা করে বাজার করে নিয়ে যাচ্ছে। যে পরিমাণ বাজার করতে দেখেছি, তাতে তিনমাস ঘর থেকে না বের হলেও এই খাবার দাবারে অনায়াসে চলতো। এরপরেও মানুষের বাজারে যাতায়াত বন্ধ হয়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যতই মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, তাতে কোন ফল আসেনি। মানুষ যার যার মতো করে বাজারে আসছে গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে যতোভাবে সচেতন করার চেষ্টা করা হয়েছে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য বলা হয়েছে, নিজের ও পরিবারের সুরক্ষার জন্য ঘরে থাকার জন্য বলা হয়েছে, তাতে কোন লাভ হয়নি।

আমাদের মধ্যে যাদের বাইরে যাওয়ার বা বাজার করার প্রবণতা বেশি, সে মানুষগুলো মাসখানেক ধৈর্য ধরলে আমরা হয়তো সবাই অনেকগুলো মাসের ক্ষতি থেকে বেঁচে যেতাম, বিশেষ করে আর্থিক ক্ষতি। সরকারের উচিত ছিল দু’চারদিন বাজার করার সুযোগ দিয়ে ফার্মেসি আর হাসপাতাল ছাড়া সবকিছুই এক মাসের জন্য যেকোনো মূল্যে বন্ধ করে দেওয়া। এর সুফলটা হয়তো আমরা এর মধ্যে পাওয়া শুরু করতাম। করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রধান স্বীকৃত উপায় মানুষ ঘরে থেকে এর চেইন ভেঙে দেওয়া। একমাস বাস্তবভিত্তিক লকডাউন থাকলে করোনা ভাইরাসের চেইন ভেঙে দেওয়াটা আমাদের জন্য একেবারে সহজ হতো।
যাদের ঘরে চাল, ডাল, আটা, তেল ও লবণ আছে এ দুর্যোগপূর্ণ সময় তাদের বের হওয়ার কোন প্রয়োজন ছিলোনা। আর নিম্নবিত্তের ঘরে খাবার পৌঁছানোর যে প্রতিশ্রুতি সরকার দিয়েছেন তা যথাযথ ভাবে কার্যকর হলে এ শ্রেণীর মানুষও ঘর থেকে বের হওয়ার প্রয়োজন ছিলো না।
কোন কোন মানুষ তরু তরকারি,আর মাছ কিনতে বাজারে যেন না গেলেই নয়। কাঁচা বাজারে মানুষের সমাগম দেখলে মনে হতো করোনা পরিস্থিতির ব্যাপারে এদের কোনো মাথা ব্যাথাই নেই। অথচ করোনা বিস্তারের জন্য সবচেয়ে বিপদজনক জায়গা এটি। প্রশাসন মানুষকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলার জন্য বারবার দিকনির্দেশনা দেওয়া ও উৎসাহিত করা সত্বেও মানুষ গুলো বরাবর অবহেলাই করে গেছে। সর্বশেষ নিরাপদ দূরত্বে থেকে বাজার করার জন্য কোথাও কোথাও বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কাঁচাবাজার স্থাপন করা হয়েছে।

কিন্তু তারপরেও আমরা আসলে এক্ষেত্রে কতটুকু নিরাপদ হতে পেরেছি তা ভাববার বিষয়। এটা আমাদের সুরক্ষার স্বার্থেই আমাদেরকে ভাবতে হবে। একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখা উচিত এই কাঁচামাল গুলো অন্য জেলার কত জায়গা থেকে আসে, কত হাত বদল হয়ে আসে এবং হাতগুলো করোনা মুক্ত কিনা? এরপর আমরা কাঁচা বাজারে কত দোকান থেকে তরু তরকারী কিনছি বা মাছ মাংস কিনে টাকা বিনিময় করি। এই হাত গুলি করোনা মুক্ত কিনা তা কিভাবে নিশ্চিত বলা যায়। আমাদের যদি ডাল ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে, তাহলে বাজারে গিয়ে টাকা দিয়ে করোনা বাজার করার কি দরকার ছিল ? বরং করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে আমরা কয়েক সপ্তাহ বের না হয়ে এবং প্রশাসনের নির্দেশ গুলো মেনে সরকার ও প্রশাসনকে সহযোগিতা করার প্রয়োজন ছিল।

সরকারের বিভিন্ন নির্দেশনা যখন মানুষ একের পরে উপেক্ষা করছে, আর প্রশাসন মানুষকে ঘরে রাখতে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে করতে প্রায় ক্লান্ত, আবার কেউ অসুস্থ হচ্ছে এমন সময় সরকার দেশের অর্থনীতি চাকা সচল রাখার স্বার্থে স্বল্প পরিসরে শপিংমল মার্কেট খোলার অনুমতি দিয়েছে। তার আগে গার্মেন্টস শিল্প তো চালু করে দিয়েছেই। দেশে যখন করোনা ভাইরাস রোগী লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে তখন সরকারের এমন সিদ্ধান্ত মানুষের জন্য কতটুকু মঙ্গল বয়ে আনবে একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই জানেন।

তার মানে হচ্ছে সরকার এদেশের মানুষকে ভালো রাখার জন্য যে দায়িত্ব নিয়েছিলেন, মানুষ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ায় অর্থনীতির চাকা সচল রাখার কৌশলে মানুষের ভাগ্য মানুষের উপরেই ছেড়ে দিয়েছেন। এখন মানুষ ভালো থাকবে কি মন্দ থাকবে এটা এ দেশের প্রত্যক মানুষ নিজেকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এক কথায় মানুষ নিজেরা বাঁচতে হলে নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে সুরক্ষায় শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার চেষ্টা করতে হবে। সুতরাং করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে ব্যক্তি সচেতনতাই এখন একমাত্র অবলম্বন। পাশাপাশি মনোবল তো রাখতেই হবে। এ বাস্তবটাই এখন মেনে নিতে হবে।

লেখকঃ সাংবাদিক, শিক্ষক ও চারুশিল্পী

ট্যাগ:

শীর্ষ সংবাদ:
মতলব ব্রিজে ছয় চাকার গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ গেল তরুণের চাঁদপুরে মা ইলিশ ধরলে ৬ মাসের কারাদণ্ড, বাতিল হবে জেলে কার্ড মতলব উত্তরে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালিত দিঘলদী ইসলামিয়া জাফরিয়া দাখিল মাদ্রাসায় অভিভাবক সমাবেশ অনুষ্ঠিত বই পড়ার অভ্যাসই শিক্ষার্থীদের নেতিবাচকতা থেকে দূরে রাখবে: প্রেসক্লাব সভাপতি সোহেল রুশদী আল-আকসায় ১০ হাজারের বেশি ইসরায়েলি হামলা চালায় জাতীয় সংসদে ফেরদৌসী মিষ্টির আসন শূন্য ঘোষণা ৪০–৫০ বছর পর ওয়ারিশি সম্পত্তির দাবি, মামলা চলাকালেই ভবন নির্মাণের অভিযোগ আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলায় নিহত ২২ জন কিউআর কোডে লেনদেনে কোনো ফি লাগবে না: অর্থমন্ত্রী চাঁদপুরে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালিত ঢাকা মহানগর উত্তরের বিএনপিসহ তিন কমিটি বিলুপ্ত, বহিষ্কার ১৪ নেতা ফরিদগঞ্জে মুহাদ্দিস মাও. মো. মোশাররফ হোসাইন জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক নির্বাচিত চাঁদপুরে কারেন্ট জালের বিরুদ্ধে অভিযান, ১১ জনের কারাদণ্ড পুলিশ পরিচয়ে চালককে ফ্ল্যাটে আটকে টাকা আদায়ের অভিযোগ, আটক ৪ নারী কচুয়ায় ২৪ পিস ইয়াবাসহ ৪ মাদক কারবারি আটক জুলাই গণহত্যার দুই মামলায় আসামি পটুয়াখালী নদীবন্দরের কর্মকর্তা, জানে না কর্তৃপক্ষ মতলব উত্তরে ৩০ প্রান্তিক পেশাজীবীকে প্রশিক্ষণ ও অনুদানের চেক প্রদান কচুয়ায় মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব